Image default
ইসলাম ইসলামিক বই

৭ম হিজরী সন

সপ্তম হিজরী সনের শুরুতে সংঘটিত খায়বর যুদ্ধ

মহান আল্লাহর বাণী [ ] সম্পর্কে ইমাম শুবা– আবদুর রহমান ইব্ন আবু লায়লা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, এখানে [ ] বলে খায়বরকে বুঝানো হয়েছে। মূসা ইব্‌ন উকবা বলেন : রাসূল করীম (সা) হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করে ২০ দিন অথবা এর কাছাকাছি সময় মদীনায় অবস্থান করে খায়বরের উদ্দেশ্যে বের হন। আর আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এ খায়বরের বিজয়েরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মূসা যুহরী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হিজরী ষষ্ঠ সনে খায়বর বিজয় সম্পন্ন হয়। আর বিশুদ্ধ মতে এ বিজয় হয়। সপ্তম হিজরীর শুরুতে। যেমনটি আমরা এইমাত্র উল্লেখ করেছি। ইবন ইসহাক (র) বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করে যিলহাজ্জ মাস এবং মুহাররম মাসের কিছু অংশ মদীনায় অবস্থান করেন। এরপর মুহাররম মাসের অবশিষ্ট দিনগুলোতে তিনি খায়বরের উদ্দেশ্যে বের হন।

ইউনুস ইবন বুকায়র– মারওয়ান ও মিসওয়ার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, হুদাবিয়ার বছর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা প্রত্যাবর্তনের পথে মক্কা এবং মদীনার মধ্যবর্তী স্থান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি সূরা ফাতহ নাযিল হয়। যুলহাজ্জ মাসে তিনি মদীনায় পৌঁছান এবং খায়বরের পথে রওয়ানা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। খায়বরের পথে খায়বর ও গাতফান গোত্রের মধ্যবর্তী স্থানে রাজী নামক উপত্যকায় তিনি যাত্রা বিরতি করেন। গাতফানীরা খায়বরবাসীদের সহায়তা করবে। পরে বলে দিল তাঁর আশংকা, তাই তিনি ভোর পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করে তারপর তাদের নিকট গমন করেন। হাফিয বায়হাকী (র) বলেন, সপ্তম হিজরীর প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বহির্গত হওয়া সম্পর্কে এ মর্মের একটা বর্ণনা ওয়াকিদী থেকে বর্ণিত আছে। আবদুল্লাহ্ ইবন ইদরীস ইবন ইসহাক থেকে আবদুল্লাহ্ ইবন আবু বকর (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, মুহাররম মাসের শেষের দিকে খায়বর বিজয় হয় এবং সফর মাসের শেষের দিকে নবী করীম (সা) মদীনায় ফিরে আসেন। ইবন হিলাল বলেন, এ সময় রাসূলুল্লাহ (সা) নুসায়লা ইবন। আবদুল্লাহ্ লায়ছীকে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান।

ইমাম আহমদ (র) আফফান– আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণনা যে, আবূ হুরায়রা (র) তার সম্প্রদায়ের কিছু লোকের সঙ্গে মদীনায় আগমন করেন। নবী করীম (সা) তখন খায়বরে ছিলেন। তিনি সিবা ইবন উরফাতা গাতফানীকে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ করেন। আবু হুরায়রা (রা) বলেন : আমি সিবার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম, তখন তিনি ফজরের সালাতের প্রথম রাকআতে কাফ-হা-ইয়া-আইন-সাদ এবং দ্বিতীয় রাকআতে ওয়াইলুললিল মুতাফফিফীন সূরা পাঠ করছিলেন। তখন আমি মনে মনে বললাম, অমুকের জন্য দুর্ভোগ, যে মানুষের নিকট থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পুরাপুরি আদায় করে নেয়, আর যখন মানুষকে মেপে দেয় তখন কম দেয়। তিনি বলেন, আমীর নামায আদায় করে আমাদেরকে কিছু জিনিস দান করলে আমরা তা নিয়ে খায়বর পৌঁছি। নবী করীম (সা) তখন খায়বর বিজয় সম্পন্ন করেছেন। তিনি মুসলমানদের সঙ্গে কথা বলেন এবং গনীমতের মালে আমাদেরকেও শরীক করেন।

ইমাম বায়হাকী সুলায়মান ইবন হারুব– বনূ গিফারের একদল লোক থেকেও হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।

ইবন ইসহাক (র) বর্ণনা করেন যে, নবী করীম (সা) মদীনা থেকে খায়বরের পথে বের হয়ে আস্র পাহাড়ের পথে গমন করেন এবং তথায় একটা মসজিদ নির্মাণ করেন। তারপর সাহবা’ নামক স্থানে আগমন করেন; এরপর তিনি সৈন্যদেরকে নিয়ে অগ্রসর হয়ে রাজী নামক উপত্যকায় অবস্থান নেন। সেখানে খায়বরবাসী এবং গাতফানীদের মধ্যস্থলে অবস্থান গ্রহণ করেন, যাতে তাদের মধ্যে অন্তরায় হন, যেন তারা খায়বরবাসীদেরকে সাহায্য করতে না পারে। কারণ, তারা ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিপরীতে খায়বরের য়াহূদীদের জন্য সাহায্যকারী। আমি জানতে পেরেছি যে, গাতফানের লোকেরা যখন এটা জানতে পারে তখন একত্র হয়ে বের হয় যাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে য়াহূদীদেরকে সাহায্য করতে পারে। তারা সবেমাত্র এক মনযিল পথ অতিক্রম করেই পেছনে সহা- সম্পদ আর পরিবার-পরিজনের মধ্যে হৈ চৈ শ্রবণ করে তাদের ধারণা জন্ম যে, মুসলমানরা পেছন থেকে তাদের উপর হামলা চালাচ্ছে। তাই তারা পেছনে ফিরে এসে নিজেদের সহায় সম্পদ আর পরিবার-পরিজনের মধ্যে অবস্থান গ্রহণ করে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও খায়বরের মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি।

ইমাম বুখারী (র) আবদুল্লাহ্ ইবন মাসলামা– বুশায়র সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সুওয়ায় ইবন নুমান তাঁকে জানান যে, খায়বরের বছরে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে বের হন। এমন কি খায়বরের নিকটবর্তী সাহবা’ নামক স্থানে পৌঁছে আসরের সালাত আদায় করে খাবার আনার জন্য বললে কেবল ছাতু আনা হলো তিনি তা ভিজাতে বলেন। তা ভিজানো হলে তিনি আহার করেন এবং তাঁর সঙ্গে আমরাও আহার করি। এরপর মাগরিবের নামাযের জন্য দাঁড়িয়ে কুলি করে সালাত আদায় করেন। এজন্যে তিনি আর নতুন করে উযূ করেননি।

ইমাম বুখারী (র) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন মাসলামা– সালামা ইবনুল আকওয়া সূত্রে বর্ণনা করেন : আমরা রাত্রিবেলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে খায়বরের উদ্দেশ্যে বের হই। তখন আমাদের এক ব্যক্তি আমীরকে বললোঃ হে আমীর! তুমি কি আমাদেরকে তোমার কিছু শোনাবে না? আর আমীর ছিলেন একজন কবি। তখন তিনি বাহন থেকে অবতরণ করে লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করে হুদী গান শোনান :

হে আল্লাহ! তুমি না থাকলে আমরা হিদায়াত তথা সরল পথের সন্ধান পেতাম না, আমরা সদকা করতাম না এবং সালাত আদায় করতাম না। সুতরাং তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর, যতদিন আমরা জীবিত থাকি, তোমার তরে নিজেদের জান কুরবান হোক। নাযিল কর আমাদের উপর শান্তি ও নিরাপত্তা।

আমরা যখন মুখোমুখি হবো তখন আমাদেরকে অবিচল রেখো। আমাদের প্রতি হুংকার দেওয়া হলে আমরা তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করি। চিৎকার দ্বারা আমাদের বিরুদ্ধে লোকজন জড়ো করা হয়।

পংক্তিগুলো শ্রবণ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসা করলেন, কে এই হুদী’ গায়ক? লোকেরা জানালো ও আমীর ইবনুল আকওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : আল্লাহ্ তার প্রতি রহম করুন। তখন আমাদের মধ্যে একজন বললো? তার জন্য (শাহাদাত) অবধারিত হয়ে গেছে। ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আপনি তার দ্বারা (আরো কিছু কাল) আমাদেরকে যদি উপৃকত হওয়ার সুযোগ দান করতেন। আমরা খায়বর পোঁছে তাদেরকে অবরোধ করে ফেলি। এ সময় আমরা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ি। এরপর আল্লাহ্ তা’আলা মুসলমানদেরকে খায়বরে বিজয় দান করেন। যেদিন খায়বর বিজয় হয় সেদিন বিকালে লোকেরা অনেকগুলো চুলো প্রজ্বলিত করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানতে চাইলেন : এসব কিসের আগুন? কেন, কিসের জন্য এ আগুন জ্বালাচ্ছ? লোকেরা বললেন : গোশত পাকাবার জন্য। তিনি বললেন, কিসের গোশত? বলা হল : গৃহপালিত গাধার গোশত। তখন নবী করীম (সা) বললেন : গোশত আর শুররা প্রবাহিত কর এবং (পাত্র) ভেঙ্গে ফেল। তখন এক ব্যক্তি বললো : ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আমরা কি তা প্রবাহিত করে পাত্র ধুয়ে ফেলবো? নবী করীম (সা) বললেন : এটাও হতে পারে। লোকেরা যখন সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়, আর আমীর এর তলোয়ার ছিল খাট, তিনি এ খাট তরবারি দ্বারা ইয়াহূদীর পায়ের গোছায় আঘাত করা শুরু করেন। তরবারির আঘাত তার নিজের হাঁটুতে লাগে এবং এতেই আমীর এর মৃত্যু হয়। যখন তারা ফিরে আসছিলেন তখন (আমীর এর ভাই) সালমা বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে দেখে আমার হস্ত ধারণ করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন :তোমার কি হয়েছে : আমি বললাম ও আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোন। লোকদের ধারণা আমীর এর সকল আমল পণ্ড হয়ে গেছে। তখন নবী করীম (সা) বললেন : যে ব্যক্তি এমন কথা বলে সে মিথ্যা বলে। তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। এরপর তিনি দু আঙ্গুল একত্র করেন। তিনি একজন মুজাহিদের মতো জিহাদ করেছেন। খুব কম আরবই পৃথিবীর বুকে আমিরের মতো পদক্ষেপে বিচরণ করেছে। ইমাম মুসলিম (র)ও এ হাদীছটি হাতিম ইবন ইসমাঈল প্রমুখের বরাতে ইয়াযীদ ইবন আবু উবায়দ সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইবন ইসহাক আমীর ইবন আকওয়া এর কাহিনী অন্যভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মুহাম্মাদ ইবন ইব্রাহীম– নাস্র ইবন দুহর আসলামী সূত্রে তিনি তদীয় পিতা থেকে। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে খায়বর সফরকালে আমীর ইব্‌ন আফওয়াকে বলতে শুনেছেন- আর ইনি ছিলেন সালামা ইবন আমীর ইবন আকওয়া এর চাচা, হে ইবনুল আওয়া! তুমি নীচে নেমে এসো এবং আমাদেরকে তোমার কিছু কবিতা শুনাও। রাবী বলেন, তিনি নীচে নেমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে নিম্নোক্ত কবিতা শুনান–

আল্লাহর শপথ, আল্লাহ্ না থাকলে আমরা হিদায়াত পেতাম না। আমরা সদকা করতাম না, সালাত আদায় করতাম না। আমরা এমন লোক যখন কোন জাতি আমাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার করে আর বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় আমরা তা প্রতিরোধ করি। সুতরাং তুমি আমাদের প্রতি শান্তি ও নিরাপত্তা নাযিল কর। এবং আমাদেরকে অবিচল রাখ, যখন আমরা সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হই। তার কবিতা শ্রবণ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন : তোমার পালনকর্তা তোমার প্রতি রহম করুন, দয়া করুন। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আপনি যদি তার দ্বারা আমাদেরকে (আরো কিছু সময়) উপকৃত হওয়ার সুযোগ দিতেন। তার জন্য তো শাহাদত অনিবার্য হয়ে গেছে। খায়বরের দিন তিনি শহীদ হন। ইমাম বুখারী-এর মতো তিনিও তার মৃত্যুর বর্ণনা উল্লেখ করেছেন।

ইন ইসহাক আতা ইব্‌ন আবৃ মারওয়ান– আবৃ মাতাব ইবন আম্র সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বরে দাঁড়িয়ে সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, আর আমিও তাদের মধ্যে ছিলাম, তোমরা সকলে দাঁড়াও। এরপর তিনি বললেন :

এলাহী! সপ্ত আকাশ এবং তা যার উপর ছায়া বিস্তার করে, সে সবের পালনকর্তা, ভূমি এবং ভূমি যা কিছু ধারণ করে সে সবের পালনকর্তা, সমস্ত শয়তান আর শয়তানরা যাদেরকে গোমরাহ করে তাদের পালনকর্তা, বায়ু আর বায়ূ যেসব বস্তুকে উড়িয়ে নিয়ে যায় সেসবের খায়বরে আলী ইবন আবু তালিব (রা) রাসূল করীম (সা) থেকে পেছনে পড়ে যান আর সেদিন তাঁর চোখে পীড়া ছিল। তখন তিনি বললেন : আমি কি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পেছনে পড়ে থাকবো? একথা বলে তিনি এসে নবী করীম (সা)-এর সঙ্গে যোগ দেন। আমরা রাত্রি যাপন। করি, যে রাত্রে খায়বর বিজয় হয়, সেদিন ভোরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : আগামী কাল আমি এমন লোকের হাতে পতাকা দেবো, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাকে ভালবাসেন (অথবা তিনি বলেন- আগামী কাল এমন ব্যক্তি পতাকা গ্রহণ করবেন)। তার হাতে খায়বর বিজয় হবে আমরা সকলেই খায়বর বিজেতা হওয়ার প্রত্যাশী ছিলাম। বলা হলো : এই যে আলী (রা)! রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর হাতে পতাকা তুলে দেন আর তাঁর হাতেই খায়বর বিজয় হয়। ইমাম বুখারী (র) ও ইমাম মুসলিম (র) কুতায়বার বরাতে হাতিম সূত্রেও হাদীছটি বর্ণনা করেন। ইমাম বুখারী (র) কুতায়বা– আবু হাযিম সূত্রে বর্ণনা করে বলেন :

সাহল ইবন সা’দ আমাকে জানান যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের দিন আমাকে বললেন :আগামী কাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে এ পতাকা তুলে দেবো, যিনি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে ভালবাসেন এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)ও যাকে ভালবাসেন। তাঁর হাতে আল্লাহ্ খায়বরের বিজয় দান করবেন। লোকেরা কানাঘুষার মধ্যে রাত্রি যাপন করেন, কার হাতে এ পতাকা দেয়া হয় কে জানে। ভোরে লোকজন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হন। সকলেই আশা পোষণ করেন। এ পতাকা তাকে দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞেস করলেন, আলী ইবন আবু তালিব কোথায়? লোকেরা আরয করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তাঁর চোখ ব্যধিগ্রস্ত । রাবী বলেন, লোক প্রেরণ করে তাঁকে ডেকে এনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার দুচোখে মুখের লালা লাগিয়ে তাঁর জন্য দু’আ করলে তিনি এমন সুস্থ হয়ে উঠেন যেন কোন ব্যথাই ছিলনা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিলে হযরত আলী (রা) বললেন : তারা আমাদের মতো (মুসলিম) না হওয়া পর্যন্ত আমি তাদের সঙ্গে লড়াই করে যাবো? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : ধীরে সুস্থে তাদের দিকে এগিয়ে যাবে এবং তাদের আঙ্গিনায় পৌঁছে ইসলামের দিকে তাদেরকে আহ্বান জানাবে, তাদের উপর আল্লাহ্ তা’আলার যে অধিকার বর্তায়, সে সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত করবে। আল্লাহর শপথ, তোমার দ্বারা একজন লোকের হিদায়াত লাভ করা তোমার লাল বর্ণের উটের মালিক হওয়ার চেয়ে অনেক উত্তম। ইমাম মুসলিম (র) এবং ইমাম নাসাঈ (র) উভয়ে কুতায়বা সূত্রে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।

সহীহ মুসলিম এবং বায়হাকীতে সুহায়ল ইব্‌ন আবু সালিহ তাঁর পিতা সূত্রে। তিনি হযরত আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন :

রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন : আমি আগামীকাল এমন এক ব্যক্তির হাতে এ পতাকা তুলে দেবো, যে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাকে ভালবাসেন এবং তার হাতে আল্লাহ্ (খায়বরের) বিজয় দান করবেন । (একথা শ্রবণ করে) উমর (রা) বলেন, কেবল সেদিনই আমার মনে নেতৃত্ব লাভের আকাক্ষা জাগে। রাসূল করীম (সা) হযরত আলী (রা)-কে ডেকে এ বলে তাকে প্রেরণ করেন : যাও এবং লড়াই করতে থাক যতক্ষণ না আল্লাহ্ তোমার হাতে বিজয় দান করেন। পেছনে ফিরে তাকাবেনা, এদিক সেদিক দেখবে না। আলী (রা) জিজ্ঞেস করলেন : কোন্ বিষয়ে আমি তাদের সঙ্গে জিহাদ করবো? রাসূল করীম (সা) বললেন : আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর বান্দা ও রাসূল যতক্ষণ তারা এ কথার সাক্ষ্য না দেয় ততক্ষণ তুমি তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ অব্যাহত রাখবে। তারা একথা স্বীকার করে নিলে তারা তাদের জান-মালের নিরাপত্তার অধিকারী হবে। তবে কারো অধিকার হরণ করলে তার দন্ড ভোগ করতে হবে তাদের হিসাব আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। এ হাদীছের শব্দমালা বুখারী শরীফের।

ইমাম আহমদ (র) মুসআব ইবন মিকদাম– আবু সাঈদ খুদরী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন ও আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন :

রাসূলুল্লাহ্ (সা) পতাকা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে বললেন : হক আদায় করে কে এ পতাকা ধারণ করবে? এক ব্যক্তি এগিয়ে এসে বললো- আমি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, যাও । অপর এক ব্যক্তি এগিয়ে এলে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : যাও। এরপর নবী করীম (সা) বললেন : সে সত্তার শপথ, যিনি মুহাম্মাদের মুখমণ্ডলকে গৌরবদীপ্ত করেছেন, এমন এক ব্যক্তিকে আমি এটা দান করবো, যে পলায়ন করবে না। এরপর তিনি বললেন : হে আলী! ধারণ কর। তিনি এগিয়ে যান এবং আল্লাহ্ তাঁর হাতে খায়বর ও ফাদাক এর বিজয় দান করেন। বিজয়ের পর তিনি তথা থেকে উন্নতমানের আজওয়া, খেজুর এবং শুকনা গোশত নিয়ে আসেন। ইমাম আহমদ এককভাবে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন এবং এ হাদীছের সনদেও কোন ত্রুটি নেই, তবে একজন রাবী সম্পর্কে বিতর্ক রয়েছে। হাদীছটিতে কিছুটা বিরল বর্ণনাও রয়েছে।

ইউনুস ইবুন বুকাইর– আম্‌র ইবনুল আওয়া সূত্রে বর্ণনা করে বলেন যে, নবী করীম (সা) আবু বকর (রা)-কে খায়বরের কোন এক দুর্গের প্রতি প্রেরণ করেন। তিনি জিহাদ শেষে ফিরে আসেন। অনেক চেষ্টা করেও তা জয় করতে সক্ষম হননি। এরপর উমর (রা)-কে প্রেরণ করেন। তিনিও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : আগামী কাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা দেবো, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাকে ভালবাসেন এবং যিনি আল্লাহ্ এবং আল্লাহর রাসূলকে ভালবাসেন। আল্লাহ্ তার হাতে বিজয় দান করবেন এবং তিনি পলায়নকারী নন। সালমা বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্‌ন আবু তালিবকে ডাকেন। তখন তার চোখে অসুখ ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার দু চোখে লালা দিয়ে বললেন : পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাও যতক্ষণ না আল্লাহ্ তোমার হাতে বিজয় দান করেন। আলী (রা) পতাকা নিয়ে বের হলেন দ্রুত গতিতে চললেন আর আমরা তার পশ্চাতে পদাংক অনুসরণ করছিলাম। তিনি পাথরের টিবিতে পতাকা গাড়লেন। এটা ছিল দুর্গের নীচে। এক ইয়াহূদী দুর্গের চূড়া থেকে মাথা তুলে দেখলো। বললো : কে তুমি? তিনি বললেন : আমি আলী ইবন আবু তালিব। তখন ইয়াহূদী বললো, মূসার উপর যা অবর্তীর্ণ হয়েছে (অর্থাৎ তাওরাত) তার শপথ করে বলছি, তোমরা জয়ী হবে। আল্লাহ্ তার হাতে বিজয় দান না করা পর্যন্ত তিনি সেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করেননি।

ইমাম বায়হাকী (র) হাকিম– আবদুল্লাহ ইবন বুরায়দা সূত্রে, তিনি তদীয় পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন : খায়বরের দিন আবু বকর (রা) পতাকা ধারণ করেন। কিন্তু বিজয় অর্জন ছাড়াই তিনি প্রত্যাবর্তন করেন। মাহমূদ ইবন মাসলামা শহীদ হলে লোকেরা ফিরে আসে। তখন রাসূল করীম (সা) বললেন ও আগামীকাল আমি আমার পতাকা এমন এক ব্যক্তির হাতে ন্যস্ত করবো, যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ভালবাসে আর আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলও যাকে ভালবাসেন। আল্লাহ তার হাতে বিজয় সূচিত না করা পর্যন্ত সে ব্যক্তি ফিরে আসবে না। আগামীকাল বিজয় নিশ্চিত এ আশায় আমরা প্রশান্ত চিত্তে রাত্রি যাপন করি। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফজরের সালাত আদায় করে পতাকা নিয়ে আসতে বলেন এবং নিজে দাঁড়িয়ে থাকেন । রাসূল করীম (সা)-এর নিকট যার কিছু মর্যাদা আছে সে-ই আশা পোষণ করে যে, সেই হবে রাসূলের কাক্ষিত ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আমার যেটুকু স্থান আছে, তাতে আমি আশা পোষণ করি এবং মাথা তুলে এগিয়ে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইবন আবু তালিবকে তলব করেন। তখন তিনি চক্ষু পীড়ায় ভুগছিলেন। রাবী বলেন, রাসূল করীম (সা) তাঁর চোখে হাত বুলান আর তাঁর হাতে পতাকা তুলে দেন। তিনি বিজয় অর্জন করেন। তখন আমি আবদুল্লাহ্ ইবন বুরায়দাকে বলতে শুনি, তিনি বলছিলেন, তিনি ছিলেন মারহাবকে হত্যাকারী।

ইবন ইসহাক সূত্রে ইউনুস বলেন যে, খায়বরের দুর্গগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম নাম’ দুর্গ জয় করা হয়। সেখানেই মাহমূদ ইবন মাসলামাকে শহীদ করা হয়। উপর থেকে তাঁর মাথায় যাতা নিক্ষেপ করা হলে তাতে তিনি শহীদ হন।

ইমাম বায়হাকী (র) ইউনুস ইবন বুকায়র– আবদুল্লাহ্ ইবন বুরায়দা সূত্রে তিনি তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) কখনো কখনো মাথা ব্যথায় [মূলে — শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ আমার সামনের দিক বা উভয় দিকের ব্যথা।]  আক্রান্ত হতেন। তখন দু একদিন ঘর থেকে বের হতেন না। খায়বরেও তিনি মাথা ধরায় আক্রান্ত হন। এ সময় তিনি লোকজনের সম্মুখে উপস্থিত হননি। হযরত আবু বকর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পতাকা নিয়ে বের হন এবং তুমুল জিহাদ শেষে প্রত্যাবর্তন করেন। এরপর হযরত উমর (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) পতাকা ধারণ করে তীব্র জিহাদ করেন যা ছিল পূর্বের চেয়ে আরো অনেক কঠোর; কিন্তু তিনিও ফিরে আসেন। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অবহিত করা হলে তিনি বললেন, আগামী কাল আমি এমন লোকের হাতে এ পতাকা তুলে দেবো, যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলও যাকে ভালবাসেন। আর সে ব্যক্তি শক্তি প্রয়োগে উক্ত অঞ্চল জয় করবেন। (রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন একথা বলেন) তখন সেখানে আলী (রা) ছিলেন না। প্রতিটি কুরায়শী আর প্রতিটি ব্যক্তি আশা পোষণ করেছিলেন যে, তিনিই হবেন সে ব্যক্তি। প্রত্যুষে একটা উটে আরোহণ করে হযরত আলী (রা) আগমন করে উট থেকে নেমে তা বাঁধলেন। এসময় তিনি চক্ষুপীড়ায় ভুগছিলেন। এ কারণে তাঁর চক্ষুদ্বয়ে কাতারী কাপড় দ্বারা পট্টি বাঁধা ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার কী হয়েছে : বললেন, চক্ষু ব্যথা করছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমার কাছে এসো। (তিনি কাছে এলে) রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর চোখে মুখের লালা লাগান। এরপর তাঁর জীবনের অন্তিম দিন পর্যন্ত আর কখনো তিনি চক্ষু পীড়ায় আক্রান্ত হননি। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিলে তিনি পতাকা নিয়ে রওয়ানা হন। এসময় তাঁর গায়ে ছিল ‘আরজুয়ান’ এর লাল জুব্বা। তিনি খায়বরে আগমন করলে দুর্গের অধিপতি মারহাব বেরিয়ে আসে। মারহাবের শিরে ছিল ইয়ামানী শিরস্ত্রাণ । পাথরের কারুকার্য করা এ শিরস্ত্রাণ তিনি মাথায় ব্যবহার করেন। আর মুখে নিম্নেধৃত কবিতা আবৃত্তি করছিলেন :

খায়বর জানে যে, আমি মারহাব! অস্ত্রধারী অভিজ্ঞ নেতা আমি। সিংহ ক্ষিপ্ত হয়ে যখন সম্মুখে এগিয়ে আসে এবং বিজয়ীর হামলার ভয়ে যখন সে পিছনে সরে যায়।

এর জবাবে আলী (রা) হুংকার দিয়ে আবৃত্তি করেন :

আমি সে ব্যক্তি, যার নাম রেখেছেন তার মা হায়দর বলে। যেন জঙ্গলের সিংহ আর কি। শক্ত আমার পাকড়াও। আমি তোমাদেরকে মেপে দেবো এক সা’ এর বিনিময়ে এক মান্দারা (এক বড় মাপের পরিমাণ বিশেষ)।

রাবী বলেন, এরপর উভয়ে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হন। একে অন্যের উপর আঘাত হানেন। হযরত আলী (রা) তার উপর এমন তীব্র আঘাত হানেন যা প্রস্তরকেও তা খানখান করে দেয়। যা মস্তক ভেদ করে মাড়ির দাঁত পর্যন্ত পৌঁছে। এরপর তিনি খায়বর নগরী অধিকার করে নেন।

হাফিয বাযযার আব্বাদ ইবন ইয়াকুব– ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে খায়বরের দিন হযরত আবু বকর (রা), হযরত উমর (রা), অবশেষে হযরত আলী (রা)-কে প্রেরণ করা এবং তাঁর হাতে খায়বর বিজয়ের কাহিনী বর্ণনা করেছেন। তবে তাঁর বর্ণনার কিছুটা বৈকল্য আর অগ্রাহ্যতা রয়েছে এবং তার সনদে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। যিনি শিয়াবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত। আল্লাহ্ই ভাল জানেন।

ইমাম মুসলিম (র) এবং ইমাম বায়হাকী (র) হাদীছের শব্দমালা ইমাম বায়হাকী- ইকরিমা ইবুন আম্মার– সালামা ইবনুল আওয়া। তিনি তাঁর পিতা সূত্রে দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করে তাতে ফাজারা যুদ্ধ থেকে তাদের প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গ উল্লেখপূবর্ক বলেন যে, আমরা তথায় তিন দিন অবস্থান করে খায়বরের উদ্দেশ্যে বের হই। রাবী বলেন যে, আমীর নিম্নেধৃত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাস্তায় বের হন–

আল্লাহর কসম! আপনি না থাকলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, সাদাকা করতাম না, নামায আদায় করতাম না। আপনারা দয়া থেকে আমরা বিমুখ হতে পারি না। সুতরাং আপনি আমাদের প্রতি শান্তি নাযিল করুন।

আর আমরা যখন সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হই তখন আমাদের পদ দৃঢ় ও স্থির রাখবেন।

রাবী বলেন, কবিতা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞেস করলেন, এগুলো কার কবিতা? লোকেরা বললো : আমীর নামক এক কবির। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তোমার পালনকর্তা তোমাকে ক্ষমা করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কারো জন্য বিশেষভাবে দু’আ করলে সে শাহাদাত লাভ করতো। তখন উমর (রা) বললেন : আর এ সময় তিনি ছিলেন উটের পিঠে । আরো কিছুকাল যদি আমীর দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত হতে দিতেন। রাবী বলেন, আমরা যখন খায়বর আগমন করি তখন মারহাব তরবা উঠিয়ে নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে বের হয়–

খায়বর জানে যে, আমি মারহাব, আমি অস্ত্র চালাই, আমি দক্ষ নেতা। যখন যুদ্ধে এগিয়ে এসে স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে। রাবী বলেন, তখন আমীর (রা) নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের ডাক দেন–

খায়বর জানে যে, আমি আমীর, অস্ত্র চালনায় দক্ষ, যোদ্ধা, আমি যুদ্ধ করি; কিন্তু পেছনে সরে যাইনা।

রাবী বলেন, এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে উভয়ে একে অপরকে তরবারি দ্বারা আঘাত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে মারহাবের তলোয়ার আমীর এর ঢালের উপর পতিত হয়। আমীর তাকে নীচে থেকে আঘাত করতে উদ্যত হলে নিজের তলোয়ারের আঘাতে তার প্রধান শিরা কাটা যায় এবং এর ফলে তার মৃত্যু ঘটে। সালামা (রা) বলেন, আমি বাইরে এসে দেখি, রাসূল করীম (সা)-এর একদল সাহাবী বলাবলি করছেন আমীর এর আমল বরবাদ হয়ে গেছে । আমীর নিজেকে নিজে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হাযির হই, তখন আমি কাঁদছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন- তোমার হয়েছে কী? আমি বললাম : লোকেরা বলছে আমীর এর আমল বরবাদ হয়ে গেছে। তিনি জানতে চাইলেন, এমন কথা কে বলছে? আমি বললাম, আপনার একদল সাহাবী । তিনি বললেন, ওরা মিথ্যা কথা বলছে। বরং তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ পুরস্কার । রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোক প্রেরণ করে আলী (র)-কে ডেকে পাঠান। এ সময় তাঁর চক্ষু পীড়া ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : আজ আমি এমন ব্যক্তির হাতে পতাকা দেবো, যে আল্লাহ্ ও তার রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে ভালবাসে। রাবী বলেন, আমি আলী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে নিয়ে আসলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী (রা)-এর চোখে তাঁর মুখের লালা লাগালে তিনি সুস্থ হন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর হাতে পতাকা তুলে দেন। এ সময় মারহাব নিম্নেক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে সম্মুখ সমরে প্রবৃত্ত হয় :

তখন আলী (রা)ও নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে এগিয়ে যান–

আমি সে ব্যক্তি, মা যার নাম রেখেছে হায়দর। আমি বনের ভয়াল-ভয়ংকর সিংহের মতে আমি তাদেরকে ছা এর মাপে পুরাপুরি দেবো। এই বলে তিনি মারহাবের মাথায় তরবারি দ্বারা আঘাত হানেন। এতে তার মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। মারহাব নিহত হয়। দুর্গ জয় হয়। এমনই বর্ণিত আছে যে- হযরত আলী (রা)-ই অভিশপ্ত মারহারের হত্যাকারী ।

ইমাম আহমদ (র) হুসাইন–..– আলী (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আলী (রা) বলেছেন মারহাবকে হত্যা করে আমি তার মস্তক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে হাযির করি। পক্ষান্তরে মূসা ইবন উকবা যুহরী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, মারহাবকে যিনি হত্যা করেছেন তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা, ইমাম মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকও অনুরূপ মত ব্যক্ত করেছেন। জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ সূত্রে বর্ণনা করে তিনি বলেন : মারহার ইয়াহূদী নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করে খায়বর দুর্গ থেকে বহির্গত হয় :

খায়বরবাসী জ্ঞাত আছে যে, আমি মারহাব। আমি সশস্ত্র, অভিজ্ঞ ও বীর। কখনো বর্শা দ্বারা আঘাত হানি, আবার কখনো আঘাত করি তরবারি দ্বারা। সিংহ যখন ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে আসে তখন সে আমার চারণভূমির নিকটেও ঘেষতে পারে না।

তার এ কবিতা শুনে কা’ব ইবন মালিক (রা) জবাবে বলেন :

খায়বর জানে যে, আমি কা’ব আমি দুঃখ-কষ্ট দূর করি, আমি বীর-কঠোর। যখন যুদ্ধ শুরু হয় আর তীব্ররূপ নেয়। আমার কাছে তলোয়ার, আকীক পাথরের ন্যায় মূল্যবান ও ধারালো।

তা বিনাশ সাধন করবে তোমাদের, শেষ পর্যন্ত বিপদই সহজ মনে হবে। সে তরবারি এমন এক ব্যক্তির হাতে আছে, যাতে কোন খুঁত নেই, নেই কোন ত্রুটি। বর্ণনাকারী বলেন যে, মারহাবা এ কবিতা আওড়াতে আওড়াতে বলছিল এমন কে আছে যে আমার সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পারে? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, কে এর মুকাবিলা করবে? তখন মুহাম্মাদ ইবন মাসলাম দাঁড়িয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আমি তার মুকাবিলা করতে প্রস্তুত। আল্লাহর কসম, আমি মযলূম ও প্রতিশোধপ্রার্থী। সে গতকাল আমার ভাইকে হত্যা করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তুমি তার দিকে এগিয়ে যাও। তারপর তিনি দু’আ করলেন- “হে আল্লাহ! এ কাজে তাকে সাহায্য কর।” তাদের একজন অপরজনের নিকটবর্তী হলে এক প্রকাণ্ড প্রাচীন বৃক্ষ উভয়ের মধ্যে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় (যে প্রাচীন বৃক্ষ থেকে অনবরত আটা নিগর্ত হতো। তাদের একজন অপরজনের থেকে এ বৃক্ষের মাধ্যমে, আত্মরক্ষা করছিলেন। আর অপরজন নিজ তরবারি দ্বারা বৃক্ষের আড়াল করা অংশে আঘাত করছিলেন। শেষ পর্যন্ত উভয়ে মুখোমুখি হলেন। এভাবে বৃক্ষটা তাদের উভয়ের মধ্যে দণ্ডায়মান একজন লোকের মত হয়ে যায়। তখন মারহাব মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার উপর তরবারি দ্বারা আঘাত হানে আর তিনি ঢাল দ্বারা এ আঘাত ঠেকান। তিনি ঢালের উপর থেকে তরবারি টেনে বের করে নিয়ে তার উপর পাল্টা আঘাত হানেন এবং এভাবে মারহাবকে হত্যা করেন। ইমাম আহমদ (র) ইয়াকূব ইব্‌ন ইব্রাহীম সূত্রে তিনি তাঁর পিতা থেকে আর তিনি ইবন ইসহাক থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন। ইবন ইসহাক (র) বলেন, কারো কারো ধারণা, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবকে হত্যা করার সময় নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।

حلو اذا شئت وسم قاض

قد علمت خیبرانی ماض

খায়বর জানে যে, আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ আর মিষ্ট, যখন আমার অভিপ্রায় হয়। আবার আমি হলাহলও। অনুরূপ জাবির প্রমুখ থেকে ওয়াকিদী বর্ণনা করেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাই ছিল মারহাবের হত্যাকারী। ওয়াকিদী (র) আরো উল্লেখ করেন যে, মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা মারহাবের পদদ্বয় কর্তন করলে সে বলে- আমার জীবন লীলাই সাঙ্গ করে দাও। তখন তিনি বলেন, না (এভাবে সহজে তোমাকে মরতে দেওয়া হবে না, বরং) মাহমূদ ইবন মাসলামা যেভাবে মৃত্যুর স্বাদ উপভোগ করেছে, তোমাকেও সেভাবে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। এরপর হযরত আলী (রা) তার নিকট দিয়ে অতিক্রমকালে তিনি মারহাবের মস্তক কর্তন করেন। তারপর তাঁরা উভয়ে মারহাবের অস্ত্র-শস্ত্র সম্পর্কে বিবাদে প্রবৃত্ত হন। তাঁরা এ বিরোধ নিয়ে রাসূল (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হলে রাসূল করীম (সা) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামাকে মারহাবের তরবারি শিরস্ত্রাণ, বর্ম ও বর্শা দান করেন। ওয়াকিদী (র) বলেন, তার তরবারির উপর এ কবিতাটি লেখা ছিল–

هذا سيف مرحب من يذقه يعطب

এটা হল মারহাবের তলোয়ার, যে ব্যক্তি এর স্বাদ গ্রহণ করবে, সে বিনাশ হবে।

ইবন ইসহাক (র) বলেন, মারহাবের মৃত্যুর পর তার ভাই ইয়াসির বেরিয়ে এসে বলে? আমার সাথে মল্লযুদ্ধে অবর্তীর্ণ হতে পারে এমন কে আছে? হিশাম ইবন উরওয়া ধারণা করেন যে, যুবায়র (রা) তার সম্মুখে উপস্থিত হলে তাঁর মা আবদুল মুত্তালিব-এর কন্যা সাফিয়্যা বললেন :ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমার সন্তান তো মারা পড়বে। রাসূল করীম (সা) বললেন, না, বরং তোমার পুত্র তাকে হত্যা করবে ইনশাআল্লাহ্! তারপর উভয়ে লড়াইয়ে প্রবৃত্ত হলে যুবায়র (রা) তাকে বধ করেন। ইবন ইসহাক (র) বলেন, এরপর যুবায়রকে যখন বলা হতো, আল্লাহর শপথ, সেদিন তোমার তরবারি ছিল খুব ধারালো। তখন তিনি বলতেন? আল্লাহর কসম, তা ধারালো ছিল না, বরং তরবারির তীব্র চাপে আমি তাকে বধ করেছি।

রাসূল করীম (সা)-এর আদিকৃত গোলাম আবু রাফে সূত্রে ইবন ইসহাক এর বরাতে ইউনুস বর্ণনা করেন যে, আবু রাফে’ বলেন :

“রাসূল করীম (সা) আলী (রা) কে তাঁর পতাকা দিয়ে যখন খায়বরে প্রেরণ করেন তখন তাঁর সঙ্গে আমরাও ছিলাম। তিনি দুর্গের নিকটবর্তী হলে দুর্গের বাসিন্দারা বেরিয়ে তাঁর কাছে আসে । তিনি একা তাদের সঙ্গে লড়াই করেন। জনৈক য়াহূদী তাঁর প্রতি আঘাত হানলে তিনি তাঁর হাত থেকে ঢাল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দুর্গের দরজাকে ঢাল বানিয়ে নেন আর তা দ্বারা প্রতিরোধ করেন। দূর্গ জয় করা পর্যন্ত এ দরজা তাঁর হাতে ছিল। দুর্গের দরজা হাতে নিয়ে লড়াই করতে করতে আল্লাহ্ তাকে বিজয় দান করেন। তারপর তিনি হাত থেকে দরজাটি ছুঁড়ে ফেলে দেন। আবু রাফে বলেন, আমরা ৮জন লোক মিলে (যাদের মধ্যে আমি ছিলাম ৮ম ব্যক্তি) দরজাটা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেয়ার চেষ্টা চালিয়েও সক্ষম হইনি। অবশ্য এর সনদে একজন অজ্ঞাতনামা রাবী রয়েছেন। সনদটি বিচ্ছিন্নও বটে।

অবশ্য হাফিয বায়হাকী (র)ও হাকিম (র) মুত্তলিব ইবন যিয়াদ—জাবির সূত্রে বর্ণনা করেনঃ

জাবির (রা) বলেন : খায়বরের দিন আলী (রা), একটা দরজা উত্তোলন করেন এবং মুসলমানগণ তার উপর আরোহণ করে খায়বর জয় করেন। পরবর্তীতে ৪০ জন লোক অনেক চেষ্টা করেও দরজাটি উত্তোলন করতে পারেননি। এ বর্ণনাতেও দুর্বলতা আছে। এ ছাড়া এক দুর্বল বর্ণনায় হযরত জাবির থেকে বর্ণিত আছে যে, ৭০ জন লোক চেষ্টা করেও দরজাটি (যথাস্থানে) পুনঃস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। ইমাম বুখারী (র) মাক্কী ইবন ইব্রাহীম– ইব্ন আবু উবায়দ সূত্রে বর্ণনা করেন :

যে তিনি বলেছেন, সালামার পায়ের গোছায় আঘাতের চিহ্ন দেখে আমি জিজ্ঞাসা করি; আবু মুসলিম! এটা কিসের চিহ্ন? জবাবে তিনি বললেন : এটা খায়বরের দিন আঘাতের চিহ্ন। লোকেরা বলাবলি করে যে, সালামা বুঝি মারাই গেল। তখন আমি নবী করীম (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হলে তিনি (আঘাতের স্থানে) তিনবার ফুঁ দিলে অদ্যাবধি আমি আর সে স্থানে ব্যথা অনুভব করিনি। ইমাম বুখারী (র) আবদুল্লাহ্ ইবন মাসলামা– সহল সূত্রে বর্ণনা করেন :

যে, কোন এক যুদ্ধে নবী করীম (সা) এবং মুশরিকরা সম্মুখ যুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ হয়। উভয় পক্ষ নিজ নিজ সেনাদলের দিকে ধাবিত হয়। আর মুসলমানদের মধ্যে এমন একজন লোক ছিল, যে কোন মুশরিককে একা পেলে পেছন থেকে তরবারী দ্বারা আঘাত না করে ছাড়তো না। কোন একজন বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অমুক ব্যক্তি এমন কাজ করেছে যা ইতিপূর্বে আমাদের মধ্যে আর কেউ করেনি? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : সে জাহান্নামী। তখন লোকেরা বললো, সে যদি জাহান্নামী হয় তবে আমাদের মধ্যে আর কে জান্নাতী হবে? তখন সকলের মধ্য থেকে একজন বললো : আমি তার পেছনে লেগে থাকবো; সে দ্রুত গমন করুক আর ধীরে গতিতে, (সর্বাবস্থায়) আমি তার সঙ্গে থাকব। আহত হয়ে লোকটি দ্রুত মৃত্যু কামনা করল। সে তরবারির হাতল মাটিতে স্থাপন করে এবং ধারালো অংশ বুকের সঙ্গে চেপে ধরে সজোরে চাপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। তখন পেছনে লেগে থাকা লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে বললো আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল! তিনি জিজ্ঞেস করলেন : ব্যাপার কী? লোকটি রাসূল করীম (সা)-কে সকল কথা খুলে বললে তিনি বললেন : একজন লোক মানুষের দৃষ্টিতে বাহ্যতঃ জান্নাতী ব্যক্তির ন্যায় আমল করে; কিন্তু আসলে সে জাহান্নামী; পক্ষান্তরে অপর ব্যক্তি বাহ্য দৃষ্টিতে জাহান্নামীর মতো আমল করে; কিন্তু পরিণামে সে হবে জান্নাতী । ইমাম বুখারী (র) কুতায়বা সহল সূত্রেও হাদীছটি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুখারী আবুল ইয়ামান– আবু হুরায়রা সূত্রে বর্ণনা করেন বলে

“খায়বর (যুদ্ধে) আমরা উপস্থিত ছিলাম। রাসূল করীম (সা) ইসলামের দাবীদার তাঁর জনৈক সফর সঙ্গী সম্পর্কে বললেন : এ ব্যক্তি জাহান্নামী। যুদ্ধ ক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে লোকটি প্রচণ্ড লড়াই করে। লোকটি অনেক আঘাত পেল। (রাসূল করীম (সা)-এর উক্তি সম্পর্কে অনেকের সন্দিহান হওয়ার উপক্রম হল। লোকটি আঘাতের প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করলো। সে তুণীরে হাত দিয়ে তা থেকে কয়েকটি তীর বের করলো আর সেগুলোর দ্বারা নিজের জীবন নাশ করলো। ব্যাপারটা অনেকের কাছে গুরুতর ঠেকলো। তারা রাসূল করীম (সা)-কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ্ তা’আলা আপনার কথা সত্যে পরিণত করেছেন। সেতো নিজেকে যবাই করে আত্মহত্যা করছে। তখন রাসূল করীম (সা) বললেন : হে অমুক! উঠে দাঁড়াও এবং ঘোষণা দাও যে, মু’মিন ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর আল্লাহ্ তা’আলা ফাঁসিক পাপাচারী ব্যক্তি দ্বারাও দীনের সাহায্য করেন। মূসা ইবন উকবা যুহরী সূত্রে জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ দাসের কাহিনী উল্লেখ করেছেন। যাকে আল্লাহ্ একই সঙ্গে ঈমান এবং শাহাদতের দৌলতে ধন্য করেছেন। অনুরূপ ভাবে ইবনু লাহিআ আবুল আসওয়াদ ও উরওয়া সূত্রেও এ কাহিনীটি বর্ণনা করেন : তা নিম্নরূপঃ

“খায়বরবাসীদের নিকট জনৈক কাফ্রী ক্রীতদাস এলো, যে ছিল তার মালিকের ছাগপালের রাখাল। সে যখন দেখতে পেলো যে, খায়বরবাসীরা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে, তখন সে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে তোমরা কী চাও? তারা বললো : আমরা এ ব্যক্তির সঙ্গে লড়াই করবো, যে নিজেকে নবী বলে দাবী করছে। এতে তার মনে নবীর কথা জাগলো। তাই সে বকরী নিয়ে রাসূল করীম (সা)-এর সমীপে হাযির হলো। জিজ্ঞেস করলো, আপনি কিসের দিকে আহ্বান জানান? তিনি বললেন : আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাই। আমি এজন্য আহ্বান জানাই যে, তুমি সাক্ষ্য দেবে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ্ নেই আর আমি আল্লাহর রাসূল। আর তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদত করবে না। রাবী বলেন, তখন গোলাম বললো, আমি যদি একথার সাক্ষ্য দেই এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনি তাহলে আমি কি পাবো? রাসূল করীম (সা) বললেন, একথায় অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করতে পারলে তুমি জান্নাত লাভ করবে। তখন গোলামটি ঈমান এনে বললো : ইয়া রাসূলাল্লাহ! এসব বকরীতো আমার নিকট আমানত। তখন রাসূল করীম (সা) বললেন : এসব বকরীকে কংকর নিক্ষেপে আমাদের সৈন্যদলের আওতা থেকে তাড়িয়ে দাও। আল্লাহ্ তা’আলা তোমার আমানত যথাস্থানে পৌঁছাবেন। সে তাই করলো আর বকরীগুলো তার মালিকের নিকট ফিরে গেল। তখন য়াহূদী আঁচ করতে পারলো যে, তার গোলামটি ইসলাম গ্রহণ করেছে। তখন রাসূল করীম (সা) দাঁড়িয়ে লোকদেরকে উপদেশ দিলেন। এরপর রাবী আলী (রা)-কে পতাকা দেন । য়াহূদীদের দুর্গের নিকট হযরত আলী (রা)-এর গমন এবং মারহাবকে হত্যা করার কথাও উল্লেখ করলেন। সাথে সাথে আলীর সঙ্গে মিলে সেই কৃষ্ণাঙ্গ দাসের লড়াই করা এবং তার মৃতদেহ মুসলিম সেনা ছাউনিতে নিয়ে যাওয়া এসবই তিনি উল্লেখ করলেন। লোকজনের ধারণা, রাসূল করীম (সা) সেনা ছাউনিতে উপস্থিত হন। এবং সাহাবীগণকে সেখানে প্রত্যক্ষ করেন। তখন তিনি বললেন, আল্লাহ্ তা’আলা এ দাসকে সম্মানিত করেছেন আর তাকে মঙ্গল ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করেছেন। সত্যিকার অর্থে ইসলাম তার অন্তরে স্থান করে নিয়েছিল আর আমি তার শিয়রে দু’জন আয়তলোচনা হুর দেখতে পেয়েছি। হাফিয বায়হাকী (র) ইব্‌ন ওয়াহাব– জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, খায়বর যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। সৈন্যদের একটি ছোট দল রওয়ানা হল। তারা একজন লোককে পাকড়াও করলো, যার সঙ্গে বকরী ছিল। লোকটি বকরীগুলো চরাচ্ছিল। এভাবে কৃষ্ণাঙ্গ দাসের কাহিনীর মতো কাহিনী উল্লেখ করে তাতে শেষে বললেন : সে শহীদ হিসাবে মৃত্যু বরণ করে; অথচ সে আল্লাহকে একটা সিজদাও করেনি।

বায়হাকী (রা) মুহাম্মাদ ইবন মুহাম্মাদ– আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন ও জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে আরয করল : ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আমি একজন কৃষ্ণকায় কদাকার ব্যক্তি। আমার কোন অর্থ-সম্পদ নেই। আমি যদি এদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মারা যাই তবে কি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবো? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, হাঁ, তুমি জান্নাতে যাবে। লোকটি এগিয়ে এসে লড়াই করতে করতে জীবন দিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার লাশের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন : আল্লাহ্ তোমার মুখমণ্ডল উজ্জ্বল করুন, তোমার আত্মাকে পবিত্র করুন। আর তোমার সম্পদ বর্ধিত করুন এবং বললেন : আমি তার দু’জন আয়তলোচনা হুর স্ত্রীকে তাকে নিয়ে বিবাদ করতে দেখেছি, তারা তার দেহ আর জুব্বার মধ্যে কে আগে প্রবেশ করবে এ ব্যাপারে ঝগড়া করছিল। বায়হাকী (র) ইব্‌ন জুরায়জ– ইবনুল হাদ সূত্রে বর্ণনা করেন :

জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে ঈমান আনলো, আনুগত্য প্রকাশ করলো। সে বললো, আমি আপনার সঙ্গে হিজরত করবো। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার ব্যাপারে কোনও একজন সাহাবীকে ওসীয়ত করলেন। খায়বর যুদ্ধ সংঘটিত হলে রাসূল করীম (সা) গনীমতের মাল লাভ করেন এবং সে মাল বণ্টনকালে বণ্টনে তিনি তাকে অংশীদার করলেন। তাকে যে অংশ তিনি দিয়েছিলেন জনৈক সঙ্গী সাহাবীগণ তা তার নিকট পৌঁছিয়ে দেয়। লোকটি বকরী চরাত। লোকটি উপস্থিত হলে তার বন্ধু বা তাকে তার অংশ পৌঁছিয়ে দিল। সে বললো : এটা কি? জবাবে তারা জানালো, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাকে এ অংশ দান করেছেন । তখন লোকটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে তার গনীমতে অংশ লাভের কথা নিশ্চিত করে বললো : আমি এ মালের জন্য আপনার আনুগত্য নিশ্চিত হয়ে করিনি; বরং আমিতো আপনার আনুগত্য স্বীকার করেছি এজন্য যে, আমি এ দিকে তীর নিক্ষেপ করবো- একথা বলে সে তীর দ্বারা গলার দিকে ইশারা করে আর এভাবে মৃত্যু বরণ করে আমি জান্নাতে প্রবেশ করবো। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমার নিয়্যতের যদি সত্য হয়ে থাকে তবে আল্লাহ্ তা পূরণ করবেন। এরপর দুশমনের সঙ্গে লড়াই করার জন্য সকলেই রওয়ানা হলেন। (লোকটিও তাদের সঙ্গে ছিল এবং লড়াই-এ জীবন দান করলো)। লড়াই শেষে লোকটির মৃতদেহ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সমীপে উপস্থিত করা হলো। (দেখা গেল) সে যেখানে ইশারা করেছিল, সেখানেই তীরের আঘাত লেগেছে। তখন নবী করীম (সা) বললেন : এ সে ব্যক্তি? লোকেরা বললো, জ্বী হাঁ। তখন নবী করীম (সা) বললেন, সে আল্লাহর সঙ্গে সত্য অঙ্গীকার করেছিল, আল্লাহ তার অঙ্গীকারকে সত্যে পরিণত করেছেন। লোকটিকে নবী করীম (সা) তাঁর নিজের জুব্বা দ্বারা কাফন পরান এবং তার লাশ সম্মুখে রেখে জানাযার নামায পড়ান এবং (সালাত শেষে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখ থেকে) এ দুআ স্পষ্ট শোনা গেল?

اللهم هذا عبدك خرج مهاجرا في سبيلك قتل شهيدا وانا عليه شهید

হে আল্লাহ! লোকটি তোমারই বান্দা। তোমার রাস্তায় হিজরত করে বের হয়েছে। শহীদ হিসাবে সে মৃত্যুবরণ করেছে, আমি এ বিষয়ে সাক্ষ্য দিচ্ছি।

মুত’আ বিবাহ প্রভৃতি নিষিদ্ধ হওয়া

ইবন ইসহাক (র) বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কাছে নিয়ে আসা গনীমতের মাল পর্যায়ক্রমে গ্রহণ করতেন আর এক এক করে দুর্গ জয় করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সর্বপ্রথম তাদের যে দুর্গটি জয় করেন তা ছিল ‘নাএম’ দুর্গ। এ দুর্গের নিকটেই হত্যা করা হয় মাহমুদ ইবন মাসলামাহকে। তাঁকে হত্যা করা হয় উপর থেকে যাতা নিক্ষেপ করে। এরপর জয় করা হয় কামুস দুর্গ এটি ছিল বনূ আবুল হুঁকায়ক-এর দুর্গ। রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বরের য়াহূদীদের মধ্য থেকে অনেককে বন্দী করেন। এসব বন্দীদের মধ্যে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইবন আখতাবও ছিলেন। ইনি ছিলেন কিনানা ইবন রবী ইবন আবুল হুঁকায়কের স্ত্রী। সাফিয়্যার দু’জন চাচাতো বোনও ছিলেন বন্দীদের মধ্যে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত সাফিয়্যাকে নিজের জন্য পসন্দ করেন। দিহইয়া ইবন খলীফা আল-কালবী (রা) হযরত সাফিয়্যার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে আবেদন জানিয়ে ছিলেন। তিনি (সা) হযরত সাফিয়্যাকে নিজের জন্য পসন্দ করেন আর দিহইয়াকে দেন সাফিয়্যার দুই চাচাতো বোন । ইবন ইসহাক (র) বলেন, খায়বরের প্রচুর বন্দী মুসলমানদের হস্তগত হয় এবং লোকেরা সেদিন গাধার গোশত ভক্ষণ করে। রাসূলুল্লাহ (সা) গাধার গোশত ভক্ষণ করতে তাদেরকে নিষেধ করার কথা ইবন ইসহাক উল্লেখ করেছেন। ইমাম বুখারী (র) গাধার গোস্ত ভক্ষণ করা নিষেধ-এ পর্যায়ের হাদীছগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এবং অতি উত্তম সনদে সংকলন করেন। প্রাচীন যুগের ও পরবর্তী কালের অধিকাংশ আলিমের মতে গাধার গোশত ভক্ষণ করা হারাম। চার ইমাম এরও এ মত। তবে হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) প্রমুখ কিছু সংখ্যক আলিম গাধার গোশত খাওয়া বৈধ বলেছেন। যে সব হাদীছে গাধার গোশত হারাম বলা হয়েছে, তারা এর বিভিন্ন জবাবও দিয়েছেন। যথা ভারবহনের কাজে গাধা ব্যবহার করা হয়, তখন পর্যন্ত খুমুস তথা এক পঞ্চমাংশ বের করা হয়নি, অথবা গাধা নাপাক বস্তু আহার করে । বিশুদ্ধ কথা এই যে, গাধা মূলতই হারাম। বিশুদ্ধ হাদীছে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঘোষক ঘোষণা করেন :

ان الله ورسوله بنهيانكم عن لحوم الحمرفانهارجس فاكفؤها

والقدورتفور بها–

 আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা) তোমাদেরকে গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। কারণ, তা নাপাক। তাই তোমরা গাধার গোশত ফেলে দাও, (আর এ নির্দেশ জারী করার সময় গাধার গোশত) ডেকচীতে টগবগ করে ফুটছিল। কিতাবুল আহকাম-এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ইবন ইসহাক (র) সালামা ইবন কারকারা– . .. জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ সূত্রে বর্ণনা করেন, আর জাবির খায়বর যুদ্ধে শরীক ছিলেন না ।

أن رسول الله صلى الله عليه و سلم حين نهي الناس عن اكل لحوم الحمر

রাসূল করীম (সা) যখন লোকজনকে গাধার গোশত খেতে বারণ করেন, সে সময় তিনি তাদেরকে ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দান করেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফে এ হাদীছটি হাম্মাদ ইবন যায়দ– জাবির (রা) সূত্রে বর্ণিত হাদীছে এর সমর্থন পাওয়া যায়। বুখারী শরীফের ভাষায় বর্ণিত হয়েছে :

نهى رسول الله صلعم يوم خيبر عن لحوم الحمر ورخص في الخيل–

খায়বরের দিন রাসূলুল্লাহ (সা) গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। তবে তিনি ঘোড়ার গোশত খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। ইবন ইসহাক (র) আবদুল্লাহ ইবন আবু নাজীহ মাকহুল সূত্রে বর্ণনা করেন :

ان النبی صلعم نهاهم يومئذ عن اربع : (۱) عن اتيان الحبالي من النساء (۲) وعن أكل الحمار الاهلى (۳) وعن أكل ذي ناب من السباع (4) و عن بيع المغانم حتی تقسم–

নবী করীম (সা) সেদিন (খায়বরের দিন) চারটি বিষয় নিষেধ করেছেন : (১) যুদ্ধবন্দী অন্তঃসত্ত্বা নারীর সঙ্গে সঙ্গম (২) গাধার গোশত খাওয়া (৩) নখর বিশিষ্ট হিংস্র জন্তুর গোশত খাওয়া এবং (৪) বন্টন করার আগে গনীমতের মাল বিক্রয় করা ।

এ হাদীছটি মুরসাল পর্যায়ের। ইবন ইসহাক (র) ইয়াযীদ ইবন আবূ হাবীব– হাসান সানআনী সূত্রে বর্ণনা করেন :

আমরা রুওয়াইফে ইবন ছাবিত আল-আনসারীর সঙ্গে মাগরিব দেশের একটা জনপদে, যাকে বলা হতো ‘জিরবা’ লড়াই করি। তিনি উক্ত জনপদ জয় করে সেখানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দান। করেন। ভাষণে তিনি বলেন ।

লোক সকল! আমি তোমাদের মধ্যে কেবল এমন কথা বলবো, যা আমি রাসূল করীম (সা) কে বলতে শুনেছি। খায়বরের দিন রাসূল করীম (সা) আমাদের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেন : আল্লাহ্ আর শেষ দিনে বিশ্বাস করে এমন কোন ব্যক্তির জন্য অপরের ক্ষেতে পানি সিঞ্চণ করা হালাল নয়। অর্থাৎ অন্তঃসত্ত্বা বন্দী দাসীর সঙ্গে সঙ্গত হওয়া বৈধ নয়! আল্লাহ এবং শেষ দিনে বিশ্বাস করে এমন কোন লোকের জন্য হালাল নয় ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়ার পূর্বে কোন বন্দী দাসীর সঙ্গে সঙ্গত হওয়া। আর আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস করে এমন কোন ব্যক্তির জন্য বণ্টনের পূর্বে গনীমতের মাল বিক্রি করা হালাল নয়। আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে এমন ব্যক্তির জন্য মুসলমানদের গনীমতের পশুতে সওয়ার হয়ে তাকে দুর্বল করে ফেরত দেওয়া হালাল নয়। এবং আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস করে এমন কোন ব্যক্তির জন্য হালাল নয় যে, মুসলমানদের ধন ভাণ্ডার থেকে বস্ত্র নিয়ে পরিধান করবে আর তা পুরাতন জীর্ণ-শীর্ণ করে ফেরত দিবে । মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক (র) সূত্রে আবু দাউদ (র) এমনভাবেই হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তিরমিযী (র) হাস ইবন উমর শায়বানী– রুয়াইফি ইবন ছাবিত সূত্রে সংক্ষেপে হাদীছটি বর্ণনা করে এটি হাসান পর্যায়ের বলে মন্তব্য করেছেন। সহীহ্ বুখারীতে নাফি সূত্রে ইবন উমর (সা) থেকে বর্ণিত আছে যে,

খায়বরের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। তিনি রসুন খেতেও নিষেধ করেছেন। ইবন হাযম আলী (রা) এবং শুরাইক ই হাম্বল (রা)-এর মত উল্লেখ করেছেন যে, তাঁরা কাঁচা রসুন-পেঁয়াজ খাওয়া হারাম মনে করতেন। আর তিরমিযী (র) এ দু’জন মনীষী তা মাহ বলেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহই ভাল জানেন, বুখারী ও মুসলিম শরীফে যুহরী– আলী ইবন আবু তালিব (রা) বর্ণিত হাদীছ–

ان رسول الله نهى عن نكاح المتعة يوم خيبر وعن لحوم الحمر الأهلية

অর্থাৎ রাসূল করীম (সা) খায়বর (বিজয়ের)-এর দিন মুতআ বিবাহ এবং গৃহ পালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। এ হাদীছ সম্পর্কে হাদীছ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক কথাবার্তা বলেছেন : বুখারী ও মুসলিম শরীফে মালিক প্রমুখের বরাতে যুহরী সূত্রে বর্ণিত হাদীছ অনুযায়ী মুতআ বিবাহ হারাম ঘোষিত হয়েছিল খায়বরের দিনেই। কিন্তু দুটি কারণে এ অর্থ গ্রহণ করা মুশকিল । (এক) খায়বরের দিন মুতআ বিবাহের আদৌ কোন প্রয়োজনই ছিল না। কারণ, ভোগের জন্য সেখানে তখন নারীর অভাব ছিল না। (দুই) মুসলিম শরীফে রবী’ ইবন সাবুরা সূত্রে মা’বাদ তার পিতা থেকে বর্ণিত হাদীছে বলা হয়েছে

أن رسول الله أذن لهم في المتعة زمن الفتح ثم لم يخرج من مكة حتى نهى عنها وقال ان الله قد حرمها الى يوم القيامة فعلى هذا يكون قد نهی عنها ثم اذن فيها ثم حرمت فيلزم النسخ مرتين وهو بعيد ومع هذا فقد نص الشافعي على أنه لا يعلم شيئا أبيح ثم حرم ثم ابيح ثم حرم غير نكاح المتعة وما حداه على هذا رحمه الله الا اعتماده على هذين الحديثين كما قدمناه–

রাসূল করীম (সা) মক্কা বিজয়ের দিন তাদেরকে মুতআ বিবাহের অনুমতি দিয়েছেন, এরপর তা নিষিদ্ধ ঘোষণা না করা পর্যন্ত তিনি মক্কা ত্যাগ করেননি। তারপর তিনি বলেন : আল্লাহ্ তা’আলা কিয়ামত পর্যন্ত কালের জন্য মুতআ বিবাহ হারাম করে দিয়েছেন। এতে দেখা যায় যে, তিনি আগে নিষেধ করেছেন, পরে অনুমতি দিয়েছেন, তারপর হারাম করা হয়েছে। এতে করে দু’দফা বাতিল বা রহিতকরণ সাব্যস্ত হয়, যা সুদূর পরাহত। উপরন্তু ইমাম শাফিঈ প্রমাণ পেশ করেন যে, কোন একটা বিষয় একবার মুবাহ করা হয়, পরবর্তীতে তা হারাম করে আবার

মুবাহ এবং পুনরায় হারাম করা হয়েছে বলে জানা যায় না। কেবল মুত’আ বিবাহ এর ব্যতিক্রম। এ ক্ষেত্রে ইমাম শাফিঈ (র) যে বিষয়কে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন। তা হল হাদীছদ্বয়ের উপর তাঁর অগাধ আস্থা। এ সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমরা আলোচনা করেছি।

সুহায়লী প্রমুখ কোন কোন প্রাথমিক যুগের মনীষীর বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন যে, তাঁর দাবী মতে মুতআ তিন দফা মুবাহ করা হয় এবং তিন দফা হারাম করা হয়। অন্যরা বলেন যে, বার দফা মুবাহ এবং হারাম করা হয়। এটা তো কিছুতেই হতে পারে না। আল্লাহই ভাল জানেন। প্রথমে কখন মুতআ হারাম ঘোষণা করা হয়। সে বিষয়ে মতভেদ দেখা যায়। কেউ বলেন, খায়বরে প্রথম হারাম করা হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, উমরাতুক কাযায় আবার কারো কারো মতে মক্কা বিজয়ের দিনে। এ মতটাই স্পষ্ট। আবার কেউ কেউ বলেন, আওতাস যুদ্ধে। আর এ মতটি পূর্ববর্তী মতের নিকটবর্তী। কেউ কেউ বলেন, তবুক যুদ্ধের দিন। আবার কারো কারো মতে বিদায় হজ্জে। আবু দাউদ এসব মত উল্লেখ করেছেন। কোন কোন আলিম আলী (রা) থেকে বর্ণিত হাদীছের জবাব দেয়ার চেষ্টা করেছেন এই বলে যে, তাতে আগ-পর হয়ে গেছে। অবশ্য ইমাম আহমদ (র) বর্ণিত হাদীছটি মাহযুফ তথা নিরাপদ। এতে সুফিয়ান– আলী (রা) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, আলী (রা) ইবন আব্বাস (রা) কে বলেন :

 “রাসূল করীম (সা) খায়বরের দিনগুলোতে মুতআ বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খেতে নিষেধ করেছেন। মুহাদ্দিসগণ বলেন যে, রাবী আমাদেরকে বিশ্বাস করাবার চেষ্টা করেছেন যে, তার উক্তিতে উভয় বিষয়ের নিষেধাজ্ঞাটি ‘খায়বর’ এর দিনের সাথে সম্পৃক্ত। অথঃ ব্যাপারটা তা নয়। এই যুদ্ধ গৃহপালিত গাধার গোশত নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কিত। আর মুতআ বিবাহের ব্যাপারে এ দিনের কোন সম্পর্ক নেই। অবশ্য দুটি বিষয় একত্র করা হয়েছে এ কারণে যে, আলী (রা) জানতে পেরেছিলেন যে, ইবন আব্বাস (রা) মুতআ বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত খাওয়া উভয়টাকে মুবাহ মনে করতেন বলে প্রসিদ্ধি রয়েছে। তখন আমীরুল মু’মিনীন আলী (রা) ইবন আব্বাস (রা)-কে বললেন : আপনি ভুল বুঝেছেন। রাসূল করীম (সা) খায়বরের দিন মুতআ বিবাহ এবং গৃহপালিত গাধার গোশত নিষিদ্ধ করেছেন। এ দুটি বিষয় মুবাহ এমন বিশ্বাস থেকে হযরত ইব্‌ন আব্বাস (রা) যাতে প্রত্যাবর্তন করেন, সে জন্য তিনি দুটোর কথা এক সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। এ ব্যাখ্যার দিকেই ঝুঁকেছেন আমাদের শায়খ হাফিয আবুল হাজ্জাজ মিযমী । আল্লাহ্ তাঁকে নিজ রহমত দ্বারা ঢেকে নিন। আমীন! এতদ্সত্ত্বেও ইবন আব্বাস (রা) গাধার গোশত আর মুতআ বিবাহকে বৈধ জ্ঞান করা থেকে ফিরে আসেননি। গাধার গোশতের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাতে তার বহন আর আরোহণের কাজে ব্যবহার হতো। আর মুতআতো কেবল সফরকালে প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে তাঁর মতে মুবাহ। স্বাচ্ছন্দ্য আর স্ত্রীর উপস্থিতিতে তিনি মুতআ বিবাহকে হারাম মনে করতেন। এ ব্যাপারে তাঁর একদল অনুসারী তাকে অনুসরণ করেন। ইব্‌ন জুরাইজ এবং তৎপরবর্তী কাল পর্যন্ত হিজাযের আলিম সমাজের নিকট তাঁর এ মতই ছিল প্রসিদ্ধ। ইবন আব্বাস (রা)-এর মতের অনুরূপ একটা মত ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল থেকেও বর্ণিত আছে। তবে এ বর্ণনাটি দুর্বল । কোন কোন গ্রন্থকার ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল থেকে অনুরূপ মত উদ্ধৃত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাও ঠিক নয়। আল্লাহই ভাল জানেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার স্থান কিতাবুল আহকাম। আল্লাহরই নিকট সাহায্য কামনা করছি।

ইবন ইসহাক (র) বলেন । এরপর রাসূল করীম (সা) দুর্গ আর গনীমতের মালের নিকটবর্তী হন এবং সেসব এক এক করে হস্তগত করেন)। আবদুল্লাহ্ ইবন আবু বকর এর উদ্ধৃতি দিয়ে আসলাম গোত্রের কতিপয় লোকের বরাতে তিনি বলেন যে, সে গোত্রের শাখা গোত্র বনূ সহমের কতিপয় লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করে নিবেদন করে?

 ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমরা অভাব অনটনের শিকার। এখন আমাদের হাতে কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে তাদের কিছু দেবেন তাও আনছিল না। তখন আল্লাহর নবী (সা) তাদের জন্য দু’আ করলেন, হে আল্লাহ! তুমি তাদের অবস্থা জান, তাদের শক্তি বলতে কিছুই নেই আর আমার হাতেও তাদেরকে দেয়ার মতো কিছুই নেই । তাই তুমি তাদের হাতে ইয়াহুদীদের সবচেয়ে বড় দুর্গের বিজয় দান কর। খাদ্য ও চর্বির বিবেচনায় তাদের যে দুৰ্গটা সবচেয়ে সেরা, তা-ই তুমি তাদেরকে জয় করতে দাও। তাই প্রত্যুষে লোকেরা হামলা চালায় এবং ইয়াহুদীদের সা’দ ইবন মু’আয দুর্গ জয় করে নেয়। খাদ্য আর চর্বি লাভের উৎসরূপে খায়বরে এর চেয়ে বড় দুর্গ আর ছিল না।

ইবন ইসহাক (রা) বলেন ও রাসূল করীম (সা) যখন তাদের দুর্গ জয় করে নেন (এবং গনীমতের মালও হস্তগত করেন) তখন ইয়াহূদীরা ওয়াতীহ ও সুলালিম দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে। আর এ দুর্গটি সবশেষে বিজিত হয়। রাসূল করীম (সা) তের দিন বা তার চেয়ে অধিককাল পর্যন্ত এ দুর্গ অবরোধ করে রাখেন। ইবন হিশাম (রা) বলেন :

খায়বরের দিন মুসলমানদের সংকেত ধ্বনি ছিল : ইয়া মনসুর আমিত আমিত!

منصور امت امت)

ইবন ইসহাক (র) বুরায়দা ইবন সুফিয়ান— আবুল য়ুস্র কা’ব ইবন আমর সূত্রে বর্ণনা করেন :

একদিন সন্ধ্যায় আমি খায়বরে রাসূল করীম (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। এসময় কোন এক ইয়াহূদীর ছাগপাল বাইরে থেকে দুর্গের দিকে আসছিল। আর আমরা তখন তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিলাম। তখন রাসূল করীম (সা) বললেন : এমন কে আছে যে এ বকরীগুলো থেকে আমাদেরকে খাওয়াতে পারে? আবুল য়ূর বলেন, আমি নিবেদন করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি এজন্য প্রস্তুত। তিনি বললেন, যাও দেখি। আমি তখন উট পাখির মতো ছুটে গেলাম। রাসূল করীম (সা) আমার দিকে তাকিয়ে দুআ করলেন : হে আল্লাহ! তার দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত কর। তিনি বলেন, আমি সেখানে যখন পৌঁছি তখন বকরীরপালের সামনের অংশ দুর্গের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল। আমি পালের শেষ মাথা থেকে দুটো বকরী ধরে বগলদাবা করে রাসূল করীম (সা)-এর দরবারে এমনভাবে ছুটে আসি যেন আমার কাছে কিছুই নেই। আমি বকরী দুটো এনে রাসূল করীম (সা)-এর সম্মুখে রাখি। সাহাবীগণ বকরী দুটি যবাই করে আহারের ব্যবস্থা করেন। আর আবুল য়ুসর ছিলেন সকলের শেষে মৃত্যুবরণকারী রাসূল করীম (সা)-এর সাহাবীগণের অন্যতম। এ হাদীছ বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি কেঁদে ফেলতেন। তিনি বলেন, সাহাবীগণ আমার দ্বারা উপকৃত হন। শেষপর্যন্ত আমিই হলাম তাঁদের (অর্থাৎ সাহাবীদের) মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তিদের অন্যতম।

 হাফিয় বায়হাকী তার দালাইল গ্রন্থে আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ— আবু উছমান নাহদী বা আবূ কুলাবা সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসূল করীম (সা) যখন খায়বরে পৌঁছেন তখন খেজুর কাঁচা ছিল । লোকেরা ছুটে গিয়ে কাঁচা খেজুর খেয়ে জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রাসূল করীম (সা)-এর নিকট অনুযোগ করলে রাসূল (সা) বললেন : পুরাতন মশকে পানি শীতল করে প্রত্যুষে আল্লাহর নাম নিয়ে পান করবে। তারা তাই করেন এবং সুস্থ হন। হাফিয বায়হাকী (র) আবদুর রহমান ইবন রাফি সূত্রে অবিচ্ছিন্ন সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেন। এতে মাগরিব এবং ইশার মধ্যবর্তী সময়ের উল্লেখ রয়েছে। ইমাম আহমদ (রা)— আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল সূত্রে বর্ণনা করেন। খায়বরের দিন চর্বি ভর্তি একটি থলে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তা হাতে নিয়ে আমি বললাম, আমি এখান থেকে কাউকে কিছু দেবো না। তিনি বলেন, আমি পেছনে ফিরে দেখি রাসূল করীম (সা) মুচকি হাসছেন। ইমাম আহমদ (র) আফফান–  আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল সূত্রে বর্ণনা করেন ।

 “আমরা খায়বর প্রাসাদ অবরোধ করে রাখি, এ সময় আমাদের দিকে চর্বির একটা থলে নিক্ষেপ করা হলে আমি গিয়ে তা হাতে নেই এবং তখন রাসূল করীম (সা)-কে দেখতে পেয়ে আমি লজ্জিত হই। ইমাম বুখারী ও মুসলিম (র) শুবা সূত্রেও হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। মুসলিম (রা) শায়বান ইবন ফররুখ সূত্রে উছমান ইবন মুগীরার বরাতেও হাদীছটি বর্ণনা করেন ইবন ইসহাক (র) আবদুল্লাহ্ ইবন মুগাফফাল মুনী সূত্রে বর্ণনা করেন যে, খায়বারের গনীমতের মাল থেকে আমি এক থলে চর্বি কাঁধে নিয়ে আমার আস্তানা এবং বন্ধুদের নিকট গমন করি । গনীমতের মালের দায়িত্বশীল আমাকে পথে পেয়ে পাকড়াও করে নিয়ে যান এবং বলেন, এসো এসব মুসলমানদের মধ্যে বন্টন করে দেই। আমি বললাম, আল্লাহর কসম, আমি কিছুতেই তা তোমাকে দেবো না। তিনি আমার নিকট থেকে থলে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য টানাটানি করেন। আমি যখন এরকম করছিলাম তখন রাসূল করীম (সা) আমাদেরকে দেখে হাসলেন, আর গনীমতের মালের দায়িত্বশীলকে বললেন, তাকে যেতে দাও। তিনি আমাকে ছেড়ে দিলে আমি তা নিয়ে ঘরে ফিরে যাই এবং বন্ধু-বান্ধব নিয়ে তা আহার করি।’

য়াহূদীদের যবাই করা জন্তুর চর্বি হারাম- ইমাম মালিক (র)-এর এ মতের বিরুদ্ধে জমহুর আলিম এ হাদীছটিকে প্রমাণ হিসাবে পেশ করেন। কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন :

وطعام الذين أوتو الكتاب حل لكم

আর আহলি কিতাবদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল। ইমাম মালিক (রা)-এর জবাবে বলেন যে, চর্বি খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। উপরোক্ত হাদীছ থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করাও বিচার সাপেক্ষ। এমনও তো হতে পারে যে, তাদের জন্য হালাল পশু থেকে এ চর্বি নেয়া হয়েছিল। আল্লাহই ভাল জানেন।

এ হাদীছ দ্বারা এ প্রমাণও উপস্থাপন করা হয় যে, খাদ্য শস্যে খুমুস বা এক-পঞ্চমাংশ ধার্য হয় না। আবু দাউদ (র) বর্ণিত মুহাম্মাদ ইবন আলা— আবদুল্লাহ্ ইবন আবু আওফা সূত্রের হাদীছ দ্বারা এমতের সমর্থন পাওয়া যায়। এ হাদীছে উল্লেখ আছে?

قال قلت کنتم تخمسون الطعام في عهد رسول الله ص فقال اصبنا

طعاما يوم خيبر وكان الرجل يجي فيأخذ منه قدر ما بكفيه ثم ينصرف تفردبه ابو داود هو حسن–

তিনি বলেন, আমি বললাম, রাসূল করীম (সা)-এর যুগে আপনারা কি খাদ্য শস্য থেকে এক-পঞ্চমাংশ (খুমুস) বের করতেন : জবাবে তিনি বলেন : খায়বরের দিন আমরা খাদ্য শস্য লাভ করি। একজন লোক এসে তার জন্য যতটুকু প্রয়োজন তা নিয়ে যেতেন। ইমাম আবু দাউদ (র) এককভাবে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। হাদীছটি ‘হাসান’ পর্যায়ের ।

হযরত সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই (রা)-এর ঘটনা

রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বনূ নযীর ইয়াহুদীদেরকে তাদের দুষ্কর্মের জন্যে মদীনা থেকে বিতাড়িত করেন তখন তাদের অধিকাংশই খায়বারে গিয়ে বসবাস শুরু করে। তাদের মধ্যে ছিল হুয়াই ইবন আখতাব এবং আবুল হুকাইকের সন্তানরা। আর তারা ছিল তাদের সম্প্রদায়ে ঐশ্বর্য ও মর্যাদার অধিকারী। তখন হযরত সাফিয়্যা ছিলেন অপ্রাপ্ত বয়স্কা। তারপর যখন তার বিয়ের বয়স হয় তখন তাঁর একজন চাচাতো ভাই তাকে বিয়ে করে। তাদের বাসর হওয়ার কয়েক দিন পর একদিন তিনি স্বপ্নে দেখেন যে, আকাশের চাঁদ যেন তার কোলে এসে পড়েছে। তিনি তার এ স্বপ্নের কথা স্বামীর কাছে বর্ণনা করলে তাঁর স্বামী রেগে যায় এবং তাঁকে চপেটাঘাত করে এবং বলে ইয়াসরিব অধিপতি তোমার স্বামী তোক এটাইকি তুমি কামনা কর? তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের বাসিন্দাদেরকে অবরোধ করে ফেললে এবং খায়বারের পতন ঘটলে হযরত সাফিয়া (রা) কয়েদীদের অন্তর্ভুক্ত হন এবং তাঁর স্বামী নিহত হয়। তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে নিজের জন্যে পসন্দ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কর্তৃত্বাধীনে এসে যান। পবিত্রতা অর্জনের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তার সাথে বাসর ঘর করতে গিয়ে তার চেহারায় উক্ত আঘাতের দাগ দেখতে পান ও তার কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন তিনি তাঁর উক্ত শুভ স্বপ্নের কথা বলেন ও তাঁর স্বামীর নির্যাতনের কথা বর্ণনা করেন।

ইমাম বুখারী (র) বলেন, আমাদেরকে সুলায়মান ইবন হাব (র)– আনাস ইবন মালিক (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের অতি নিকটে অন্ধকার থাকতেই ফজরের সালাত আদায় করেন। এরপর বলেন, “আল্লাহ্ মহান, খায়বার ধ্বংস হয়ে যাবে, নিশ্চয়ই আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের আঙ্গিনায় হাযির হই তখন সতর্কীকৃতদের প্রভাত হয় কতই না মন্দ! এরপর খায়বারবাসীরা পরাজিত হয়ে এদিক সেদিক পলায়ন করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যোদ্ধাদেরকে হত্যা এবং তাদের পরিবার-পরিজনদের বন্দী করার আদেশ দেন। বন্দীদের মধ্যে হযরত সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই (রা)-ও ছিলেন। তিনি প্রথমে হযরত দিহইয়া কালবী (রা)-এর ভাগে পড়েন। পরে অবশ্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অংশে আসেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আযাদ করে বিবাহ করেন এবং তাঁর মুক্তিকেই মোহরানা সাব্যস্ত করেন।

মুসলিম (র) ও বিভিন্ন সনদে আনাস (রা) হতে হাদীছটি বর্ণনা করেন। ইমাম বুখারী (র) আদম— আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা)-কে কয়েদী হিসেবে গ্রহণ করেন, তিনি তাঁকে মুক্ত করে দেন এবং পরে বিবাহ করেন। একজন বিশিষ্ট বর্ণনাকারী ছাবিত (রা) হযরত আনাস (রা)-কে জিজ্ঞেস করেন “তিনি তাঁর মোহরানা কী দিয়েছিলেন?” উত্তরে হযরত আনাস (রা) বলেন, তিনি তার মুক্তিকেই মোহরানা সাব্যস্ত করেছিলেন। এ বর্ণনায় ইমাম বুখারী (র) ছিলেন একক।

বুখারী (র) আবদুল গাফফার ও আহমদ ইবন ঈসা আনাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। আনাস (রা) বলেন, “আমরা খায়বারে আগমন করলাম। যখন দুর্গগুলো আমাদের হস্তগত হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াইর গুণ-গরিমার কথা বর্ণনা করা হল। তার স্বামী নিহত হয়েছিল এবং তিনি ছিলেন সদ্য বিবাহিতা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে নিজের জন্যে পসন্দ করলেন । তাঁকে নিয়ে বের হলেন এবং সুদ্দাস সাহবা নামক স্থানে পৌঁছার পর সাফিয়্যা (রা) পাক-পবিত্র হলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তার বাসর হল। এরপর খেজুর ও ঘি দিয়ে ‘হাইস’ নামক এক প্রকার খাদ্য তৈরি হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনাস (রা)-কে বললেন, “তোমার আশে পাশে যারা আছে তাদেরকে দস্তরখানে ডেকে এনে খেতে দাও।” আনাস (রা) বলেন, “এটাই ছিল হযরত সাফিয়্যা (রা)-এর ওলীমা।” আনাস (রা) বলেন, এরপর আমরা মদীনার দিকে রওয়ানা হলাম । আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাঁর পিছনে সাফিয়্যা (রা)-এর একটি চাদর বিছাতে দেখেছিলাম। এরপর তিনি উটের পার্শ্বে বসলেন, হযরত সাফিয়্যা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাঁটুতে ভর দিয়ে উটে আরোহণ করেন। এ বর্ণনাটিতেও ইমাম বুখারী (র) একক।

বুখারী (র) সাঈদ ইবন আবূ মারয়াম–… আনাস সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আনাস (রা) বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে তিন রাত অবস্থান করেন। তিনি সাফিয়্যা (রা)-এর সাথে বাসর ঘর করেন। এরপর আমি মুসলমানদেরকে তাঁর ওলীমার দাওয়াত করলাম। এ ওলীমায় রুটি ও গোশতের কোন ব্যবস্থা ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা) বিলাল (রা)-কে দস্তরখান বিছাতে হুকুম করলেন। যখন দস্তরখান বিছান হল, তার মধ্যে খেজুর, পনির ও ঘি রাখা হল। সাহাবীগণ বলাবলি করতে লাগলেন, সাফিয়্যা (রা)-কে কি একজন উম্মুল মু’মিনীন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, না কি একজন দাসী হিসেবে? তাঁরা বলাবলি করতে লাগলেন, যদি তার জন্যে পর্দার ব্যবস্থা করা হয় তাহলে তিনি হবেন একজন উম্মুল মু’মিনীন, আর যদি পর্দার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তিনি একজন দাসী হিসেবে গণ্য হবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন রওয়ানা হলেন, তার পিছনে সাফিয়্যার জন্যে স্থান করে দিলেন ও পর্দার ব্যবস্থা করে দিলেন। এটিও বুখারীর একক বর্ণনা।

আবু দাউদ (র) মুসাদ্দাদ– আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, প্রথমত সাফিয়্যা (রা) দিহইয়া কালবী (রা)-এর ভাগে পড়েন। পরে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্যে হয়ে যান।

আবু দাঊদ (র) ইয়াকূব ইবন ইবরাহীম– আনাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, খায়বারের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে কয়েদীদেরকে আনা হল। তখন বিশিষ্ট সাহাবী দিহইয়া কালবী উপস্থিত হয়ে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কয়েদীদের মধ্য হতে আমাকে একজন দাসী দান করুন! রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, যাও একজনকে নিয়ে যাও। তখন তিনি সাফিয়্যা বিনতে হুয়াইকে গ্রহণ করলেন। তখন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে এসে আর করলেন। ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বনু নাযীর ও বনু কুরায়যার সর্দার হুয়াই এর কন্যা সাফিয়্যাকে দিহইয়া কালবীর হাতে তুলে দিয়েছেন। তিনি শুধু আপনারই যোগ্য। হুযূর (সা) বলেন, দিহইয়া কালবীকে সাফিয়্যাসহ ডেকে নিয়ে এসো। নবী করীম (সা) যখন তার দিকে নয়র করলেন তখন দিহইয়া কালবী (রা)-কে বললেন, তুমি অন্য একটি বন্দিনীকে নিয়ে নাও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা)-কে আযাদ করে দিলেন ও তাঁকে বিবাহ করলেন। ইবন উলাইয়া (রা) হতেও অনুরূপ বর্ণিত রয়েছে।

আবু দাউদ (র) মুহাম্মাদ ইব্‌ন খাল্লাদ বাহিলী– আনাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দিহইয়া কালবী (রা)-এর অংশে একটি সুশ্রী দাসী পড়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে সাতটি বন্দীর বিনিময়ে খরিদ করে নেন। এরপর তাকে তিনি সাজগোজের জন্য উম্মু সালামা (রা)-এর কাছে সমর্পণ করেন। রাবী হাম্মাদ (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যাকে উম্মু সালামা (রা)-এর কাছে সমর্পণ করে দিলেন যাতে সেখানে তাঁর ইদ্দতকাল অতিবাহিত হয়। এটি আবু দাউদের একক বর্ণনা।

ইন ইসহাক (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বনূ আবুল হুকাইকের নিকট থেকে কামূস নামক দুর্গটি জয় করলেন তখন সাফিয়্যা (রা) বিন্ত হুয়াই ও তার সাথে অন্য একজন বন্দিনীকেও রাসূল (সা)-এর সামনে আনয়ন করা হল। বিলাল (রা) উক্ত দুই জন মহিলাকে নিয়ে তাদের নিহত আত্মীয়-স্বজনদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সাফিয়্যা (রা)-এর সাথী মহিলাটি নিহত ব্যক্তিদেরকে দেখে উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল, মহিলাটি নিজেদের মুখে আঘাত করতে লাগল এবং মাথায় ধূলি নিক্ষেপ করতে লাগল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন বললেন, এই উচ্ছংখল নারীটিকে এখান থেকে নিয়ে যাও। কিন্তু সাফিয়্যা (রা)-কে দেখে হুযূর (সা) তাঁর জন্যে হুযূরের পিছনে বসার জায়গা করে দেন এবং তার জন্যে পর্দার ব্যবস্থা করে দেন। মুসলমানগণ বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে নিজের জন্যে পসন্দ করেছেন। সাফিয়্যার সঙ্গী ইয়াহূদী মহিলাটির কাণ্ড দেখে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিলাল (রা)-কে লক্ষ্য করে বললেন, “হে বিলাল! তোমার নিকট হতে কি রহমত ও মমতাবোধ লোপ পেয়ে গেছে যে, তুমি এ দুটি মহিলাকে তাদের সঙ্গীদের শবদেহ দেখিয়ে বেড়াচ্ছ? আর হযরত সাফিয়্যা (রা) যখন কিনানা ইবন রাবী’ ইবন আকূল হুকাইক এর নব পরিণীতা ছিলেন তখন তিনি স্বপ্ন দেখেন যে, আকাশের চাঁদ যেন তার কোলে পতিত হচ্ছে। তিনি তখন তার স্বামীর কাছে এ স্বপ্নটি ব্যক্ত করেন। স্বামী বলল, এটি তো, তোমার হিজাযের শাসক মুহাম্মাদকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বৈ কিছু না? এরপর সে তার চেহারায় আঘাত করে ফলে তাঁর চোখ নীলবর্ণ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে যখন তাঁকে পেশ করা হল তখন তার চেহারায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তিনি এ সম্বন্ধে তাঁকে জিজ্ঞেস করেন। হযরত সাফিয়্যা (রা) তখন তাঁকে বিস্তারিত জানালেন।

ইবন ইসহাক আরো বলেন, “কিনানা ইবন রাবীর নিকট বনূ নযীরের বিপুল পরিমাণ সম্পদ গচ্ছিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তাকে পেশ করা হলে, সেই সম্পদ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন; কিন্তু সে সম্পদের কথা অস্বীকার করল এবং এ সম্বন্ধে কোন কিছু জানে না বলে ব্যক্ত করল। এমন সময় এক ইয়াহূদী রাসূলের কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, সে কিনানাকে প্রতিদিন সকালে একটি ধ্বংসাবশেষের আশে-পাশে ঘুরাঘুরি করতে দেখে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিনানাকে বলেন, দেখ, তুমি বার বার অস্বীকার করছ, যদি প্রমাণিত হয় এবং তোমার কাছে সম্পদ পাওয়া যায়, তাহলে আমরা তোমাকে এ অপরাধের জন্যে মৃত্যুদণ্ড দেব । সে বলল, ঠিক আছে। “রাসূলুল্লাহ্ (সা) ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানটি খননের নির্দেশ দিলেন। কিছু সম্পদ তাতে বের হয়ে আসল। এরপরও রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে অবশিষ্ট সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন; কিন্তু সে সম্পদ সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানাল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা)-কে তাকে শাস্তি দেবার নির্দেশ দিলেন। যুবায়র (রা) চকমকি দিয়ে তার বুকে ঘষতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর কাছে তাকে সমর্পণ করেন। যাতে তিনি তাঁর ভাই মাহমূদ ইবন মাসলামার হত্যার বদলে তাকে হত্যা করেন ।

অধ্যায় : ইবন ইসহাক বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারবাসীদেবকে তাদের আল-ওয়াতীহ এবং আস-সুলালিম দুর্গদ্বয়ে অবরোধ করে রাখেন। যখন তারা পরাজয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত হল তখন তারা আত্মসমর্পণ করল ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইল । রাসূলুল্লাহ (সা) তা মঞ্জুর করেন। উপরোক্ত দুইটি দুর্গ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ্ (সা) আশফাক্ক, আন-নাতাত ও আল-কাতীবাসহ তাদের সকল দুর্গের যাবতীয় সম্পদ অধিকার করে নেন। যখন ফাদাকের বাসিন্দারা খায়বারবাসীদের কৃতকর্ম ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গৃহীত সুব্যবস্থার কথা শুনতে পেল, তখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট দূত প্রেরণ করে নিজেরা আত্মসমর্পণ করল, প্রাণ ভিক্ষা চাইল ও তাদের যাবতীয় সম্পদ তাঁর হাতে অর্পণ করল । রাসূলুল্লাহ (সা) তা মঞ্জুর করলেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও খায়বারবাসীদের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী ছিলেন বনূ হারিছার মিত্র মাহীসা ইবন মাসঊদ। খায়বারের বাসিন্দারা যখন উপরোক্ত সুযোগ পেল তখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)–এর সাথে অর্ধেক শস্য ফসলের বিনিময়ে চাষাবাদের অনুমতি চাইল এবং বলল,আমরা আপনাদের চাইতে চাষাবাদ সম্বন্ধে অধিক অভিজ্ঞ ও অধিক পরিশ্রমী। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হলেন তবে আরো শর্ত রইল যে, যখনি ইচ্ছা হুযূর (সা) তাদেরকে উচ্ছেদ করতে পারবেন। আর ফাদাকের বাসিন্দারাও অনুরূপ চুক্তিতে চুক্তিবদ্ধ হল ।

অধ্যায় : দুর্গগুলোর পতন ও তথাকার জমিজমা বণ্টন

ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেন, ইয়াহূদীরা যখন নায়িম দুর্গ ও আস-সা’ব ইব্‌ন মু’আয দুর্গ। ছেড়ে দিয়ে আয-যুবায়র দুর্গে আশ্রয় নেয় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তিন দিন অবরোধ করে রাখেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আযাল নামী একজন ইয়াহূদী উপস্থিত হয়ে বলল, হে আবুল কাসিম! আমাকে প্রাণের নিরাপত্তা দেওয়া হলে আমি এমন একটি বিষয় সম্বন্ধে আপনাকে অবগত করাব যাহা আন-নাতাত ও আশ-শাক দুর্গদ্বয়ের বাসিন্দাদের অনিষ্ট থেকে আপনাকে রক্ষা করবে এবং আপনি তাদের সম্পর্কে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারবেন। আশ-শাক দুর্গের বাসিন্দারা আপনার ভয়ে অস্থির । রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার এবং তার পরিবারবর্গের জানমালের নিরাপত্তা দিলেন। তখন ইয়াহুদী লোকটি তাকে বলল, “আপনি যদি তাদেরকে এক মাসও এরূপে অবরোধ করে রাখেন এতে তাদের কিছুই অসুবিধা হবে না। তাদের রয়েছে যমীনের নিচে একটি পানির নালা। রাতের বেলায় তারা দুর্গ থেকে বের হয় এবং ঐ নালা থেকে পানি পান করে তারা পুনরায় তাদের দুর্গে ফিরে আসে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের এই নালাটি বন্ধ করে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। তখন তারা দুর্গ থেকে বের হয়ে তুমুল যুদ্ধ করে। ঐদিন কিছু সংখ্যক মুসলমান শহীদ হন এবং ইয়াহূদীদের দশ জন নিহত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ দুর্গটি জয় করেন। আর এটাই ছিল আন-নাতাতে অবস্থিত দুর্গসমূহের সর্বশেষ দুর্গ। ইয়াহূদীরা তখন আশ-শাক দুর্গে আশ্রয় নেয় । আর আশ-শাক-এর কাছে ছিল অনেকগুলো দুর্গ। এ দুর্গসমূহ হতে সর্বপ্রথম যে দুর্গটি আক্রমণ করা হয় তার নাম ছিল উবাই দুর্গ। রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি দুর্গের কাছে অবস্থান নেন, তার নাম ছিল সামওয়ান। এখানেও তুমুল যুদ্ধ হয়। ইয়াহূদীদের মধ্য থেকে আকূল নামক একজন যোদ্ধা দুর্গ থেকে বের হয়ে আসে এবং দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানায়। তখন হুবাব ইবন মুনযির (রা) তার দিকে এগিয়ে যান এবং তলওয়ারের আঘাতে ইয়াহুদীর ডান হাতটির অর্ধেক পর্যন্ত কেটে ফেলেন। তখন ইয়াহূদীর তলওয়ারটি পড়ে যায় ও সে পালিয়ে যায় হুবাব (রা) তার পিছু ধাওয়া করেন এবং তার গ্রীবা-ধমনী কেটে দেন। তখন অন্য একজন ইয়াহূদী দন্দ্ব যুদ্ধের জন্যে এগিয়ে আসে। একজন মুসলমান তার মুকাবিলায় এগিয়ে আসেন; কিন্তু ইয়াহুদী তাঁকে শহীদ করে ফেলে। এরপর ইয়াহূদীটির দিকে এগিয়ে গেলেন আবু দুজানা (রা)। তিনি তাকে হত্যা করেন। এবং তার অস্ত্রশস্ত্র লাভ করেন। এরপর ইয়াহুদীরা দ্বন্দ্বযুদ্ধ পরিহার করে। মুসলমানগণ তাকবীর ধ্বনি দিলেন। এরপর তাঁরা সামনের দুর্গটির প্রতি এগিয়ে যান ও দুর্গে প্রবেশ করেন। আবু দুজানা (রা) ছিলেন সকলের অগ্রে । তাঁরা দুর্গে নানারূপ আসবাবপত্র বকরী, খাবার সামগ্রী ইত্যাদি পেলেন। ইয়াহুদীদের মধ্যে যারা যুদ্ধ করেছিল তারা সাধ্যমত আসববপত্র নিয়ে ভালুকের ন্যায় দুর্গ হতে পলায়ন করল এবং আশ-শাক দুর্গের অধীনে আল-বাযাত দুর্গে আশ্রয় নিল ও অত্যন্ত দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম তাদেরকে প্রতিহত করতে লাগলেন। পরস্পর তীর নিক্ষেপ শুরু হল এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবাগণের সাথে নিজ হাতে তীর নিক্ষেপ করতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আঙ্গুলে তাদের তীরের আঘাত লাগে তখন তিনি এক মুষ্টি পাথর হাতে নিয়ে তাদের দুর্গের দিকে নিক্ষেপ করলেন। তাতে দুর্গটি তাদেরকে নিয়ে কেপে উঠলও মাটির সাথে মিশে গেল। মুসলমানগণ তাদেরকে পাকড়াও করলেন। ওয়াকিদী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁবুবাসীদের দিকে এবং আবুল হুকাইকের দুইটি দুর্ভেদ্য দুর্গ আল-ওয়াতী ও আস-সুলালিম এর দিকে অগ্রসর হলেন। ইয়াহূদীরা এ দুর্গগুলোতে অত্যন্ত মযবূত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আশ-শাক দুর্গের নিয়ন্ত্রণে অবস্থিত আন-নাতাত দুর্গে এসে পরাজিত ইয়াহূদীরা একত্রিত হল । আবারা তারাও অন্য ইয়াহুদীদের সাথে মিলিত হয়ে আল কামূস ও আল কাতীক দুর্গে আশ্রয় নিল। তারা দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলে এবং তারা দুর্গ থেকে কোনক্রমে বের হচ্ছিল না বা এমন কি বাইরের দিকে উঁকিও মারছিল না। অবশেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ক্ষেপনাস্ত্র স্থাপনের দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশ করলে ইয়াহূদীরা যখন তাদের ধ্বংস সম্বন্ধে নিশ্চিত হল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক তাদের অবরোধের ১৪দিন পূর্ণ হল, তখন ইব্ন আবুল হুকাইক বের হয়ে আসল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে জীবন রক্ষা ও বন্দী হবার শর্তে সন্ধি স্থাপন করল । আর এটাও শর্ত হল যে, তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিজেদের জমিজমা, সম্পদ ও সোনা রূপা, জন্তু-জানোয়ার সব কিছু হস্তান্তর করবে, তবে যতদূর সম্ভব পোশাক পরিচ্ছদ ও খাবার দাবার নিজেরা বহন করে নিতে পারবে । রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বললেন, যদি তোমরা কোন কিছু গোপন কর তাহলে তোমাদের সন্ধি ভংগ হয়েছে বলে গণ্য হবে এবং তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের কোন জিম্মা থাকবে না। উপরোক্ত শর্তগুলোর উপরই তাদের সাথে সন্ধি স্থাপিত হল ।

ইবন কাছীর (র) বলেন, এ জন্যেই যখন তারা সম্পদ গোপন করল, মিথ্যা বলল এবং বিশেষ করে বহু সম্পদে পরিপূর্ণ চামড়ার বড় থলেটি লুকিয়ে ফেলল তখন সুস্পষ্ট হয়ে গেল যে, তারা সন্ধি ভংগ করেছে। তাই আবুল হুকাইকের পুত্রদ্বয়ও তার বংশের কতিপয় লোককে চুক্তি ভংগের কারণে হত্যা করা হল।

বায়হাকী (র)— আবুল হাসান ইবন উমর (রা) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এমনকি তিনি তাদেরকে তাদের দুর্গে অবরোধ করে রাখেন। তিনি তাদের জমিজমা, ক্ষেত-খামার ও খেজুর বাগান দখল করে নেন। তারা তখন দেশান্তরিত হওয়ার শর্তে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে সন্ধি করে। তবে তারা পোশাক-পরিচ্ছদ ও খাবার দাবার যা তাদের বহনযোগে নিতে পারে তার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আর সোনা রূপা ও হাতিয়ার সব কিছু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তারা সমর্পণ করেছিল। তাদের প্রতি শর্ত আরোপ করা হয়েছিল যেন তারা কোন কিছু গোপন না করে বা কোন দ্রব্য না লুকায়। যদি তারা কোন কিছু লুকায় বা গোপন করে তাহলে তাদের সাথে আর কোন প্রকারের সন্ধি থাকবে না এবং তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার দায়িত্বও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর থাকবে না। তা সত্ত্বেও তারা একটি বড় চামড়ার থলে গোপন করল যার মধ্যে প্রচুর সম্পদ ও গহনাদি রাখা হয়েছিল এবং তা বনূ নাযীরকে বিতাড়িত করার সময় হুয়াই ইবন আখতাবের তত্ত্বাবধানে ছিল যা সে তা খায়বারে নিয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) হুয়াইর নিয়ে যাওয়া হলে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হল যে, বনূ নাযীর হতে প্রাপ্ত সম্পদ ভরা চামড়ার থলেটি সে কি করেছিল? সে বলেছিল যে, দৈনন্দিন খরচ ও যুদ্ধের ব্যয়ে তা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, এত অল্প সময়ে এত অধিক সম্পদ নিঃশেষ হতে পারে না। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে যুবায়র (রা)-এর হাওলা করলেন তিনি তাকে শাস্তি দিলেন। এর পূর্বে হুয়াইকে একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে আনাগোনা করতে দেখা গেল এবং একজন লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে হাযির হয়ে বলল, আমি হুয়াইকে এখানে আনাগোনা করতে দেখেছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশক্রমে সাহাবায়ে কিরাম তথায় গেলেন এবং খোঁজ করার পর সেখানে অর্থ সম্পদ ভরা চামড়ার থলেটি পেলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে আবুল হুকাইকের দুই পুত্রকে হত্যা করার হুকুম দিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইবন আখতাবের পূর্ব স্বামী। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের পরিবার-পরিজনকে বন্দী করে ফেলেন এবং ওয়াদা ভংগের জন্যে তাদের সম্পদ সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে বণ্টন করার আদেশ দিলেন। ফলে তিনি খায়বার হতে তাদেরকে বিতাড়িত করতে মনস্থ করলেন তখন তারা বলল, হে মুহাম্মাদ! আমাদেরকে এ যমীনে থাকতে দিন। আমরা এ যমীনের উন্নতি সাধন করব এবং তা উত্তমরূপে আবাদ করব । রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবায়ে কিরামের কাছে কোন খাদ্যশস্য ছিল না যার মাধ্যমে তারা নিজেদের ভরণ-পোষণ নির্বাহ করবেন। আর যমিন আবাদ করার মত পর্যাপ্ত সময়ও সাহাবায়ে কিরামের ছিল না। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াহূদীদেরকে খায়বার এ শর্তে দান করলেন যে, তারা খেজুর ও প্রতিটি ফসলের অর্ধেক মুসলমানদেরকে দিতে থাকবে। আবদুল্লাহ্ ইবন রাওয়াহা (রা) প্রতি বছর তাদের কাছে আসতেন এবং অর্ধেক বর্গা ফসল তাদের থেকে আদায় করতেন। একবার তারা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট নালিশ করল । অন্যদিকে তাঁকে ঘুষ দেয়ার চেষ্টা করল । আবদুল্লাহ্ ইবন রাওয়াহা (রা) বললেন, হে আল্লাহর দুশমনরা! তোমরা আমাকে ঘুষ দিতে চাও? আল্লাহর শপথ, আমি তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তির নিকট হতে এসেছি যিনি আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। আর তোমরা আমার কাছে বানর ও শূকর থেকে অধিকতর নিকৃষ্ট। এ উৎকৃষ্টতা ও নিকৃষ্টতা কিন্তু তোমাদের উপর যুলুম করার জন্যে আমাকে কখনও প্ররোচিত করতে পারে না। তারা বলল, এ নীতির উপরই এ আসমান ও যমীন দণ্ডায়মান ও পরিচালিত । রাবী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা)-এর চোখ নীল দেখতে পেলেন এবং প্রশ্ন করলেন, হে সাফিয়্যা, তোমার চোখ নীল কেন? তখন তিনি বললেন, ইবন আবুল হুকাইকের কোলে ছিল আমার মাথা। আর আমি ছিলাম নিদ্রারত । তখন আমি স্বপ্নে দেখলাম, চাঁদ যেন আমার কোলে নেমে এল । আমি তার কাছে এ স্বপ্নটি বর্ণনা করলাম। সে তখন এমন জোরে চপেটাঘাত করল এবং বলল, তুমি কি ইয়াছরিব অধিপতির আকাঙ্ক্ষা করছ? সাফিয়্যা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন আমার অত্যন্ত অপসন্দের লোক । কেননা, তিনি আমার স্বামী ও পিতার হত্যার কারণ ছিলেন । এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সব সময় এ সম্বন্ধে আমার কাছে আলোচনা করতেন এবং বলতেন, তোমার পিতা আমার বিরুদ্ধে সকল আরববাসীকে সংঘবদ্ধ করেছে এবং আমার সমূহ ক্ষতি সাধন করেছে। এরূপ বলতে বলতে কিছু দিন পর এ ক্ষোভ আমার অন্তর হতে চলে যায় । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর প্রত্যেক স্ত্রীকে প্রতি বছর ৮০ ওয়াসাক [এক ওয়াসাক = ৬০ সা’ বা প্রায় দুইশ কেজি] খেজুর এবং ২০ ওয়াসাক যব বরাদ্ধ করতেন; কিন্তু যখন হযরত উমর (রা)–এর যুগ আসল তখন ইয়াহূদীরা মুসলমানদের সাথে ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা শুরু করল। তারা ইবন উমর (রা)-কে ঘরের ছাদ থেকে ফেলে দিল, ফলে তাঁর দু হাত ভেঙ্গে যায়। তখন উমর (রা) বলেন, খায়বারের যমীনে যাদের অংশ আছে আসুন তাদের মধ্যে আমি তা বণ্টন করে দেই। তখন তিনি তা বণ্টন করে দিলেন । ইয়াহুদীদের সর্দার বলল, আমাদেরকে বিতাড়িত করবেন না, আমাদেরকে থাকতে দিন। যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও হযরত আবু বকর (রা) আমাদেরকে এখানে থাকতে দিয়েছিলেন। হযরত উমর (রা) বললেন, “তোমরা কি আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা লংঘন করতে দেখছ? তোমরাই বরং দিন দিন সন্ধির শর্তসমূহ লংঘন করে যাচ্ছ।

হযরত উমর (রা) ইয়াহুদীদেরকে তাদের ষড়যন্ত্রের দরুন বিতাড়িত করলেন এবং তাদের জমিজমা হুদায়বিয়ার সন্ধিতে উপস্থিত মুজাহিদদের মধ্যে যারা খায়বারেও উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে বণ্টন করলেন।

আবু দাউদ (র) উপরোক্ত রিওয়ায়েতটি হাম্মাদ ইবন সালামা থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেন ।

আবু দাউদ (র)– ইবন উমর (রা)-এর বর্ণনায় বলেন, যখন খায়বার বিজিত হল তখন ইয়াহূদীরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আবেদন করায় তিনি তাদেরকে উৎপন্ন ফসলের অর্ধেক দেওয়ার শর্তে তাদেরকে সেখানে থাকতে দেন এবং বলেন, আমাদের যতদিন ইচ্ছে ততদিন তোমাদেরকে থাকতে দেব। আর ইয়াহূদীরা এ শর্তের উপর সেখানে অবস্থান করছিল। খায়বারের প্রাপ্ত অর্ধেক খেজুরকে হুযূর (সা) দুই অংশে বণ্টন করতেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার থেকে এক-পঞ্চমাংশ গ্রহণ করতেন। আর এ পঞ্চমাংশ থেকে তার প্রত্যেক সহধর্মিণীকে একশত ওয়াসাক খেজুর এবং ২০ ওয়াসাক যব বরাদ্দ করতেন। যখন উমর (রা) ইয়াহূদীদেরকে তাদের ষড়যন্ত্রের দরুন বিতাড়িত করতে মনস্থ করেন। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সহধর্মিণীগণকে বললেন, আপনাদের মধ্যে যারা চান যে, তাদেরকে মাথা পিছু একশত ওয়াসাক খেজুর বরাদ্দ করব তাকে তাই দেওয়া হবে। তার জন্যে খেজুর গাছ, যমীন ও খেজুর গাছে পানি দেওয়া ইত্যাদির জিম্মা বর্তাবে। আর তাকে উৎপন্ন শস্য হতে বশ ওয়াসাক যব দেওয়া হবে । তাহলে তাকে তাই দেওয়া হবে। আর যিনি চান যে, এক-পঞ্চমাংশ হতে তার অংশ পৃথক করে দেওয়া হবে। তাহলে তাকে তাই দেওয়া হবে।

আবু দাউদ (র) মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক– আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর বর্ণনায় বলেন, উমর (রা) বলেন, হে জনমণ্ডলী, আপনারা জেনে রাখুন, রাসূলুল্লাহ (সা) খায়বারের ইয়াহূদীদের সাথে সন্ধি করেছিলেন এ শর্তে যে, যখন ইচ্ছে তখন তাদেরকে বিতাড়িত করা হবে। ইয়াহুদীদের কাছে যার কোন সম্পদ পাওনা আছে সে যেন তাদের থেকে আদায় করে নেয়। কেননা, আমি ইয়াহুদীদেরকে বিতাড়িত করব। এরপর তিনি তাদেরকে বিতাড়িত করলেন।

ইমাম বুখারী (র) ইয়াহইয়া ইবন বুকায়র–… জুবায়র ইব্‌ন মুতয়িম (রা)-এর বর্ণনায় বলেন যে, তিনি বলেছেন, আমি এবং উছমান ইব্‌ন আফফান (রা) একবার রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দরবারে হাযির হয়ে বললাম, আপনি বনূ মুত্তালিবকে খায়বারের এক-পঞ্চমাংশ হতে দান করেছেন কিন্তু আমাদেরকে দিলেন না অথচ তারাও আমরা আপনার সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একই পর্যায়ের। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, নিঃসন্দেহে বনু হাশিম ও বনূ মুত্তালিব অভিন্ন। জুবায়র ইবন মুতইম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বনু আবদে শাম্স ও বনূ নওফলের জন্য কোন কিছু বরাদ্দ করেননি । উপরোক্ত বর্ণনাটি বুখারীর একক বর্ণনা। অন্য এক বর্ণনায় আছে- রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “নিঃসন্দেহে বনূ হাশিম ও বনূ আবদে মুত্তালিব একই পর্যায়ের।” তারা আমাদের থেকে জাহিলিয়্যাত কিংবা ইসলাম কোন যুগেই বিচ্ছিন্ন হয় নাই। শাফিঈ (র) বলেন, “বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবের সাথে আবু তালিবের গিরিসংকটে প্রবেশ করেছিল এবং তাদের জাহিলিয়্যাত ও ইসলাম উভয় যুগে সাহায্য সহায়তা করেছিল।

ইবন কাছীর (র) বলেন, আবু তালিব বনূ আবদে শামস ও নওফলের কুৎসা গেয়েছেন। তিনি বলেছেন :

جزى الله عنا عبد شمس ونوف؟ + عقوبة شرعاجلا غير آجل

অর্থাৎ আমাদের বিরোধিতা করায় আল্লাহ্ যেন বনূ আবদে শামস ও বনূ নওফলকে বিলম্বে নয় অতি শীঘ্র তাদের দুস্কর্মের জন্য শাস্তি প্রদান করেন।

বুখারী (র) হাসান ইবন ইসহাক– আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর বর্ণনায় বলেন, খায়বারের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রতিটি ঘোড়ার জন্যে দুই অংশ এবং প্রত্যেক পদাতিক সৈনিকের জন্য এক অংশ বরাদ্দ করেন। উপরোক্ত হাদীছের ব্যাখ্যায় নাফি (র) বলেন, কোন লোকের সাথে যদি একটি ঘোড়া থাকে তাহলে তার হবে তিন অংশ । আর যার সাথে ঘোড়া থাকবে না। তার হবে এক অংশ ।

বুখারী (র) সাঈদ ইবন আবু মুতইম– উমার ইবন খাত্তাব (রা)-এর সনদে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমার প্রাণ যার হাতে রয়েছে তার শপথ করে বলছি, যদি আমার আশংকা

হত যে, মানুষকে আমি কপর্দকশূন্য পাব, তাদের হাতে প্রয়োজনীয় সম্পদের অভাব হবে তাহলে আমার দ্বারা কোন একটি জনপদ বিজিত হবার সাথে সাথে আমি তা এমনভাবে মুজাহিদগণের মধ্যে বণ্টন করে দিতাম যেরূপ রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের সম্পদ বণ্টন করে দিয়েছিলেন। তবে আমি তাদের জন্য গচ্ছিত রাখছি যাতে তার ভবিষ্যতে নিজেদের মধ্যে প্রয়োজনে বণ্টন করে নিতে পারে। বুখারী মালিক ও আবু দাউদ– .. উমর (রা)-এর অন্য একটি সূত্রেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। উপরোক্ত দুটি বর্ণনায় বুঝা যায় যে, খায়বারের সম্পদ পুরাপুরি যোদ্ধাগণের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছিল ।

আবু দাউদ (র)– ইবনে শিহাব (র) সূত্রে বর্ণনা করেন । তিনি বলেছেন, “আমার কাছে এমর্মে হাদীছ পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধ করে খায়বার জয় করেন এবং যুদ্ধের পর যাকে যেখানে থাকতে দেবার প্রয়োজন আছে মনে করেছেন, তাকে সেখানে থাকতে দিয়েছেন। এই রিওয়ায়াতের প্রেক্ষিতে যুহরী (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের সম্পদ হতে প্রথমত এক-পঞ্চমাংশ পৃথক করেন। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ ঐ যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করে দেন।

ইবনে কাছীর (র) বলেন, যুহরী (র)-এর উপরোক্ত মতামতটি সন্দেহাতীত নয়। কেননা, বিশুদ্ধ মতে, খায়বারের সমস্ত সম্পদ বণ্টন করা হয়নি; বরং তাঁর অর্ধেক সম্পদ অংশ গ্রহণকারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়েছিল- যা পরে আসছে। আর খায়বারের ঘটনা থেকে ইমাম মালিক (র) ও তাঁর অনুসারিগণ প্রমাণ করেছেন যে, বিজিত সম্পদের বণ্টন সম্পর্কে ইমাম পূর্ণ ক্ষমতা রাখেন, যদি তিনি চান তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে বণ্টন করে দিতে পারেন, নতুবা ভবিষ্যতে মুসলমানদের জনহিতকর কাজসমূহে খরচ করার জন্যে সংরক্ষণ করতেও পারেন। আর যদি তিনি চান তাহলে কিছু অংশ বর্তমানে বণ্টন করতে পারেন এবং অবশিষ্ট ভবিষ্যতের দুর্যোগ মুকাবিলা ও জনহিতকর কাজের জন্যে রেখে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ।

আবু দাউদ (র) রবী ইব্‌ন সুলায়মান– সহল ইব্‌ন আবু হাসমা (রা)-এর সনদে বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারে প্রাপ্ত সম্পদকে প্রথমত দু’ভাগে ভাগ করেছেন- এক ভাগ ভবিষ্যতের দুর্যোগ মুকাবিলা ও জনহিতকর কর্মকাণ্ড আঞ্জাম দেয়ার জন্যে সংরক্ষণ করেন এবং অন্য ভাগ মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করেন ও তাদের মধ্যে আঠার অংশে ভাগ করেন। এ বর্ণনাটি আবু দাউদ (র)-এর একক বর্ণনা। এরপর তিনি মুরসাল হিসেবে বাশীর ইবন ইয়াসার (রা) হতে বর্ণনা করেন। যে এক ভাগ দুর্যোগ মুকাবিলার জন্যে সংরক্ষণ করেছেন তা হচ্ছে আল-ওয়াতী, আল-কাতীবা ও আস-সুলালিম দুর্গত্রয় ও এগুলোর সংলগ্ন এলাকা। আর যে এক ভাগ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করেন তা হচ্ছে আশ-শাব ও আন-নাতাত দুর্গদ্বয় ও এগুলোর সংলগ্ন এলাকা। আর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অংশও এ দুর্গদ্বয়ের সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত ছিল।

আবু দাউদ (র) হুসায়ন ইবন আলী– রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কতিপয় সাহাবীর বরাতে বলেন, “নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বার জয় করলেন তখন প্রাপ্ত সম্পদকে ৩৬ অংশে বণ্টন করেন। আবার প্রতি অংশকে একশত ভাগে বণ্টন করেন। সমস্ত সম্পদের অর্ধেক মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করেন। অবশিষ্ট অর্ধেক ভবিষ্যতের দুর্যোগ, জনহিতকর কর্মকাণ্ড ও বহিরাগত মেহমানদের আপ্যায়নের জন্যে সংরক্ষণ করেন। উপরোক্ত রিওয়ায়াতটিও আবু দাউদ (র)-এর একক বর্ণনা।

আবু দাউদ (র) পুনরায় মুহাম্মাদ ইবন ঈসা– মুজাম্মা ইবন হারিছা আল-আনসারী (যিনি একজন প্রসিদ্ধ কারীও ছিলেন) এর বর্ণনায় বলেন, খায়বারের সম্পদ হুদায়বিয়ায় অংশ গ্রহণকারী মুজাহিদদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা আঠার অংশে বণ্টন করেন। আর সৈন্য সংখ্যা ছিল ১৫০০ তার মধ্যে ৩০০ জন ছিল ঘোড় সাওয়ার। প্রতি অশ্বারোহীকে দু’অংশ এবং পদাতিককে এক অংশ প্রদান করা হয়। এ বর্ণনাটিও আবু দাউদ (র)-এর একক বর্ণনা।

ইমাম মালিক (র) যুহরী–সাঈদ ইবন মুসায়্যিব (র)-এর সনদে বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের কিছু অংশ যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করেন।” আবু দাউদ (র) ইবন শিহাব যুহরী (র)-এর বরাতে বলেন, “খায়বারের কিছু অংশ যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করা হয় আবার কিছু অংশ সন্ধির মাধ্যমে হস্তগত হয়। কাতীবা দুর্গটির অধিকাংশ এলাকা যুদ্ধের মাধ্যমে এবং কিছু অংশ সন্ধির মাধ্যমে হস্তগত হয়। ইমাম মালিক (র)-কে জিজ্ঞেস করা হয় কাতীবা কি? তখন তিনি বলেন, তা হচ্ছে খায়বারের একটি ভূখণ্ড যেখানে রয়েছে চল্লিশ হাজার খেজুর গাছ।

বুখারী (র) মুহাম্মাদ ইবন বাশশার– আইশা সিদ্দীকা (রা)-এর সনদে বলেন, তিনি বলেছেন, যখন খায়বার জয় হয় তখন আমরা বললাম, এখন আমরা তৃপ্তি সহকারে খেজুর খেতে পারব।

হাসান (র)–… হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) সূত্রে বলেন, তিনি বলেছেন, “আমরা খেজুরে আত্মতৃপ্ত হতে পারি নাই যতক্ষণ না আমরা খায়বার জয় করতে পেরেছি।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, “আশ-শাক ও আন-নাতাত দুর্গ দুটি মুসলমানদের মধ্যে বণ্টিত হয়। আশ-শাকে ছিল তের অংশ আর আন-নাতাতে ছিল পাঁচ অংশ। এ মোট আঠার অংশকে আঠার শত অংশে বণ্টন করা হয়। যারা হুদায়বিয়ার সন্ধিতে উপস্থিত ছিলেন তাদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। তারা খায়বারে উপস্থিত থাকুন বা না থাকুন। যেমন জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) তিনি হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন; কিন্তু খায়বারে অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁকে অংশ দেয়া হয়েছে তবে জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা) ব্যতীত অন্য কেউ খায়বারে অনুপস্থিত ছিলেন না বলে জানা যায়। হুদায়বিয়ায় উপস্থিত সৈনিকের সংখ্যা ছিল ১৪০০ তাদের সাথে ২০০ ঘোড়া, প্রত্যেক ঘোড়াকে দেওয়া হয়েছিল দু অংশ । প্রতি একশত সৈনিককে আঠার ভাগের এক ভাগ দেওয়া হয়েছিল। ২০০ জন অশ্বারোহীকে তাদের ঘোড়ার জন্যে ৪০০ অংশ অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছিল । অনুরূপভাবে বায়হাকী (র)ও সুফিয়ান ইবন উয়ায়না থেকে সালিহ্ ইবন কায়সানের বরাতে বর্ণনা করেন যে, তারা ছিলেন ১৪০০ এবং তাদের সাথে ঘোড়া ছিল ২০০।

গ্রন্থকার বলেন, তাদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)ও একটি ভাগ গ্রহণ করেছিলেন। আশ-শাক দুর্গের প্রথম ভাগটি দেওয়া হয়েছিল আসিম ইবন আদীকে।

ইবন ইসহাক বলেন, “কাতীবা দুর্গের সম্পদের মধ্যে এক-পঞ্চমাংশ ছিল আল্লাহর জন্যে, এক অংশ ছিল আল্লাহর রাসূল (সা)-এর জন্যে, এক এক অংশ নিকট আত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, মুসাফির, রাসূলের সহধর্মীগণের ভরণ পোষণ এবং ফাদাকবাসীদের সাথে সন্ধি স্থাপনে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মাহীসাহ ইবন মাসউদ, তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা) ৩০ ওয়াসাক খেজুর এবং ত্রিশ ওয়াসাক (৬৩০০ কেজি) যব দিয়েছিলেন। রাবী বলেন, তাঁকে যে দুটি উপত্যকা দেওয়া হয়েছিল এগুলোর নাম হচ্ছে ওয়াদি সারীর ও ওয়াদি খাস। এরপর ইবন ইসহাক ঐসব জমি জমার বিস্তারিত বর্ণনা দেন যা রাসূলুল্লাহ (সা) অন্যদের জন্য বরাদ্দ করেছেন। খায়বারের বণ্টন ও হিসাব রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন বনূ সালামার জাব্বার ইবন সখর ইবন উমাইয়া ইবন খানসা এবং যায়দ ইবন ছাবিত (রা)।

গ্রন্থকার বলেন, “হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন রাওয়াহা খেজুরের ফসল ও ভাগ নির্ধারণের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি দুই বছর এ মূল্যায়নের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। মূতার যুদ্ধে তিনি শাহাদত বরণ করলে জাব্বার ইবন ছখর (রা)-কে এই পদে নিযুক্ত করা হয়।

বুখারী (র) ইসমাঈল– আবু সাঈদ খুদরী (রা) ও আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একবার এক ব্যক্তিকে খায়বারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তখন তিনি ওখান থেকে উৎকৃষ্ট ধরনের খেজুর নিয়ে আসেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, খায়বারের সব খেজুর কি এরূপ? তিনি উত্তরে বলেন, না। আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা সাধারণ দুই সা এর খেজুরের পরিবর্তে এক সা’ উৎকৃষ্ট খেজুর এনেছি। কিংবা খারাপ খেজুর এবং ৩ সা’এর পরিবর্তে ২ সা নিয়ে এসেছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “এরূপ করোনা, সমস্ত খেজুর দিরহামের পরিবর্তে বিক্রি করে ফেল, এরপর দিরহাম দিয়ে ভাল খেজুর খরিদ কর ।

বুখারী (র) অন্য সনদে দাওয়ার্দী– আবু সাঈদ খুদরী (রা) ও আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের মধ্য হতে বনূ আদীর এক ব্যক্তিকে খায়বারে পাঠান ও তথাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। আবার তিনি অন্য এক সনদেও অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

গ্রন্থকার বলেন, “খায়বারে বণ্টনকৃত অন্যান্য মুসলমানের মত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অংশ এবং ফাদাকের সমস্ত অংশ হচ্ছে খায়বারের এক বিস্তীর্ণ এলাকা। ইয়াহূদীরা অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়ায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সন্ধি করে। বনূ নাযীরের প্রচুর সম্পদ যার জন্যে মুসলমানগণ কোন যুদ্ধ বিগ্রহ করেননি তাও ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য নির্দিষ্ট বিশেষ সম্পদ, তার থেকে তিনি তাঁর পরিবারের বার্ষিক ভরণ-পোষণের জন্যে সম্পদ পৃথক করে রাখতেন। এরপর অবশিষ্ট সম্পদ আল্লাহর সম্পদ হিসেবে মুসলমানদের অস্ত্রশস্ত্র সগ্রহ ও জনহিতকর কাজে খরচ করা হত। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইনতিকাল করেন, ফাতিমা (রা) এবং উম্মুল মু’মিনীনগণ কিংবা সকলেই ধারণা করতে লাগলেন, তারা এসব সম্পদ রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হবেন। কিন্তু তাঁদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঐ হাদীছটি পৌঁছেনি, যাতে তিনি বলেছেন : অর্থাৎ আমরা নবীগণ কাউকে উত্তরাধিকারী করিনা আমরা যা ছেড়ে যাই তা সবই সাদাকা । ফাতিমা (রা), নবী সহধর্মিণীগণ এবং আব্বাস (রা) যখন তাঁদের অংশ দাবী করেন। আর আবু বকর (রা)-কে তাদের অংশ সমর্পণ করার জন্যে অনুরোধ জানান তখন আবু বকর (রা) তাঁদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপরোক্ত বাণীটি অবগতি করান যাতে তিনি তাদেরকে যাদেরকে ভরণ পোষণ করতেন আমিও তাদের ভরণ পোষণ করে যাব । আল্লাহর শপথ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আত্মীয়-স্বজন আমার কাছে আত্মীয়তার বন্ধন সুদৃঢ় রাখার ক্ষেত্রে আমার আত্মীয়-স্বজন থেকে অধিক প্রিয়। আবু বকর (রা)-এর এ মন্তব্য ছিল যথার্থ। কেননা, তিনি ছিলেন নেককার, অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং সত্যের অনুসারী। আব্বাস (রা) ও আলী (রা), হযরত ফাতিমা (রা)-এর মাধ্যমে এ হক দাবী করেছিলেন। তারা যখন উত্তরাধিকারী হতে পারলেন না তখন তারা চাইলেন যেন এ সাকা সম্পদের তত্ত্বাবধান তাঁরা করতে পারেন। এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেসব ক্ষেত্রে এ সম্পদ খরচ করতেন তাঁরাও যেন অনুরূপ খরচ করতে পারেন, কিন্তু হযরত আবু বকর (রা) তাদের এ দাবীও অগ্রাহ্য করেন এবং তিনি তার জন্যে সমীচীন মনে করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যেভাবে খরচ করতেন তিনিও সেভাবে খরচ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আরোপিত রীতি তিনি কোনরূপে লংঘন করবেন না। এ ব্যাপারে তখন ফাতিমা (রা) খলীফার সাথে রাগান্বিত ও ব্যথিত হন। আসলে এটা তার জন্যে শোভনীয় ছিল না। তিনি এবং মুসলমানগণ আবু বকর (রা)-এর মান-মর্যাদা ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে তার সম্পর্ক সম্বন্ধে সম্যক অবগত ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবদ্দশায় ও ইনতিকালের পর ইসলামের কীরূপ সাহায্য-সহায়তা করেছেন তা তাঁর ও মুসলমানগণের করো অজানা ছিল না। ছয়মাস পর ফাতিমা (রা) ইনতিকাল করেন। এরপর আলী (রা) খলীফার প্রতি তার বায়আত নবায়ন করেন। উমর (রা)-এর যুগে আলী (রা) ও আব্বাস (রা) তাঁদের কাছে এ সাদকার পূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের জন্যে খলীফাঁকে অনুরোধ জানান এবং কিছু সংখ্যক প্রবীণ সাহাবীদের মাধ্যমে খলীফার উপর চাপ সৃষ্টি করেন। তখন উমর (রা) তাদেরকে এ দায়িত্ব প্রদানের সম্মত হলেন। আর এটা সম্ভব হয়েছিল খলীফার কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়া এবং ইসলামী রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ও জন সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। কিন্তু এ ব্যাপারে আলী (রা) তাঁর চাচা আব্বাস (রা)-এর উপর প্রভাব বিস্তার করেন এবং পরবর্তীতে দুজনই উমর (রা)-এর কাছে মুকাদ্দমা পেশ করেন ও তাদের মতবিরোধ নিরসন কল্পে তাঁদের মধ্যে দায়িত্ব অর্পণ করার লক্ষ্যে সুপারিশ করার জন্যে একজন প্রবীণ সাহাবীকে উদ্বুদ্ধ করেন। যাতে তাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ বণ্টনকৃত সম্পদের প্রতিই শুধু লক্ষ্য রাখবেন অন্যজনের সম্পদের প্রতি দৃষ্টি দেবেন না । কিন্তু উমর (রা) এটার কঠোর বিরোধিতা করেন এবং আশংকা ব্যক্ত করেন যে, এটা পরবর্তীতে উত্তরাধিকার বণ্টনের রূপ-ধারণ করবে। তিনি বললেন, “আপনারা দুই জনই একত্রে এ সম্পদের দেখাশুনা করেন, যদি আপনারা অপরাগ হয়ে পড়েন তাহলে আমার কাছে তা ফিরিয়ে দেবেন। ঐ সত্তার শপথ, যার হুকুমে আসমান ও যমীন পরিচালিত হয়ে থাকে। আমি এ ব্যাপারে এটা ব্যতীত অন্য কোন সিদ্ধান্ত দেবনা।” তারা ও তাঁদের পরে তাঁদের সন্তান-সন্ততিগণ আব্বাসীয় যুগ পর্যন্ত এভাবে এ সম্পত্তির দেখাশুনা করতে থাকেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেরূপ বনূ নাযীরের পরিত্যক্ত সম্পদ, ফাদাকের সম্পদ ও খায়বারে প্রাপ্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অংশ খরচ করেছেন তারাও অনুরূপ খরচ করতে থাকেন।

অযোদ্ধাদের দান প্রসঙ্গে

দাস ও স্ত্রীলোকদের মধ্যে যারা খায়বারে অংশ গ্রহণ করেছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে গনীমতের মাল হতে কিছু সম্পদ প্রদান করেছিলেন; কিন্তু তাঁদেরকে সৈনিকদের ন্যায় যথারীতি অংশ প্রদান করেননি।

আবূ দাঊদ (রা) আহমদ ইবন হাম্বল— আবুল লাহামের আযাদকৃত দাস উমায়র (রা) সূত্রে বলেন, “আমি আমার মুনীবের সাথে খায়বার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলাম। উপস্থিত সকলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আমার প্রশংসা করলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে অনুমতি দিলেন। তখন আমি একটি তরবারি ঝুলিয়ে নিলাম; কিন্তু আমি ছিলাম আমার মুনীবের ভৃত্য। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বখশিস স্বরূপ কিছু দান করলেন।

তিরমিযী (র) এবং নাসাঈ (র)-ও এ হাদীছটি বর্ণনা করেন। তিরমিযী (র) এ হাদীছটি হাসান ও সহীহ্ বলে মন্তব্য করেছেন। ইবন মাজাও আলী ইবন মুহাম্মাদ সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে কিছু সংখ্যক স্ত্রীলোক খায়বার অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদেরকে ফাঁই (বিনা যুদ্ধে লব্দ সম্পদ) হতে কিছু দান করেন; কিন্তু তাদেরকে সৈনিকদের ন্যায় যথারীতি অংশ প্রদান করেননি। তিনি আরো বলেন, সুলায়মান ইবন সুহায়ম– বনূ গিফারের একজন মহিলার বরাতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, বনূ গিফারের অন্যান্য মহিলাদের সাথে আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বললাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ,! আমরা আপনার সাথে খায়বারের এ অভিযানে অংশ গ্রহণের জন্যে বের হতে আগ্রহী, যাতে করে আমরা জখমীদের সেবা করতে পারি এবং সাধ্যমত আমরা মুসলমানদের সাহায্য করতে পারি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, এL < 1 অর্থাৎ তাদেরকে অনুমতি দিলেন, বললেন, তোমাদেরকে আল্লাহ বরকত দান করুন! মহিলাটি বললেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বের হলাম। তিনি আরো বললেন, “আমি ছিলাম অপ্রাপ্ত বয়স্কা । রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে তাঁর সওয়ারীর পিছনে বসিয়ে নিলেন। তিনি বলেন, “সকালের দিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাওয়ারী হতে অবতরণ করলেন। আমিও তার সওয়ারীর পিছন থেকে অবতরণ করলাম । সাথে সাথে আমি তাতে ঋতুস্রাবের চিহ্ন দেখতে পেলাম। আর এটাই ছিল আমার প্রথম ঋতুস্রাব। তিনি বলেন, তখন আমি উষ্ট্রীর দিকে সংকোচিত হতে লাগলাম এবং অত্যন্ত লজ্জাবোধ করতে লাগলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন আমার জড়সড় অবস্থা ও আমার রক্ত দেখতে পেলেন, তখন বললেন, তোমার কী হয়েছে : মনে হয় ঋতুবতী হয়েছ। আমি বললাম, “জ্বী হ্যাঁ।” তিনি বললেন, “প্রথমত নিজকে সামলিয়ে নাও। এরপর এক পাত্র পানি নাও এবং পানিতে কিছু লবণ ঢেলে দাও। এরপর এ লবণ পানি দিয়ে সওয়ারীর গদীটা ধুয়ে ফেল। এরপর পুনরায় তুমি সওয়ারীতে উঠ।” তিনি বলেন, যখন আল্লাহ্ তা’আলা খায়বারের বিজয় দান করলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে ফাই (বিনা যুদ্ধে লব্ধ সম্পদ) থেকে কিছু কিছু দান করলেন এবং আমার গলায় যে হারটি দেখতে পাচ্ছো, তা তিনিই আমাকে দান করেছিলেন এবং নিজ হাতে তিনি এটা আমার গলায় পরিয়ে দিয়েছিলেন। আল্লাহর শপথ, এ হারটি কখনও আমি হাতছাড়া করবো না । উল্লেখ থাকে যে, সত্যিই মৃত্যু পর্যন্ত এ হারটি তার গলায়ই ছিল। তিনি ওসীয়ত করে যান, যেন এ হারটিও তার সাথে দাফন করা হয়। তিনি বলেন, যখনি তিনি হায়েয থেকে পবিত্রতা অর্জন করতেন তখনি পানির সাথে লবণ মিশাতেন এবং শেষ পর্যন্ত একথা ওসীয়ত করেন যে, তার যখন মৃত্যুর পর গোসল দেওয়া হবে তখনও যেন পানিতে লবণ দেওয়া হয়।

উপরোক্ত হাদীছটি আহমদ এবং আবু দাউদ ও মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক হতে বর্ণনা করেন।

“আমাদের ওস্তাদ আকূল হাজ্জাজ আল মিযী বলেন, ওয়াকিদী– … উমাইয়া বিন্‌ত আবুস সালতের সনদে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকেও অনুরূপ বর্ণনা করেন।

ইমাম আহমদ (র) হাসান ইবন মূসা– হাশরাজ ইবন যিয়াদের দাদী সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “খায়বার অভিযানে আমিও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সংগী ছিলাম। আর আমি ছয়জন রমণীর ষষ্ঠা মহিলা।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন টের পেলেন যে, তাঁর সাথে মহিলারা রয়েছেন, আমাদের কাছে লোক পাঠালেন ও আমাদেরকে ডাকলেন। তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে আমরা রাগান্বিত দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, “তোমরা কেন এসেছে এবং তোমরা কার হুকুমে এসেছো?” আমরা বললাম, “আমরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে এসেছি। আমরা যোদ্ধাদেরকে তীর কুড়িয়ে দেবো, ছাতু খাওয়াব এবং আমাদের সাথে রয়েছে আহতদের জন্যে ঔষধপত্র । আমরা গযল গাইব, এভাবে আমরা আল্লাহর পথে সাহায্য সহায়তা করব। রাবী বলেন, “এভাবে মহিলারা অনুমতি নিলেন ও জিহাদের ময়দানে গেলেন। উক্ত মহিলাটি বলেন, “আল্লাহ তা’আলা যখন আমাদেরকে খায়বারের বিজয় দান করলেন তখন পুরুষদের অংশের ন্যায় আমাদেরকেও অংশ দেওয়া হয়।” রাবী বলেন, আমি তখন বললাম, হে দাদী! তোমাদেরকে যা দেওয়া হয়েছিল, তা কী? বললেন, “খেজুর।”

গ্রন্থকার বলেন, মহিলাদেরকে অস্থাবর সম্পদ থেকে কিছু দেওয়া হয়েছিল তবে তাদেরকে পুরুষ সৈনিকদের ন্যায় কোন জমি অংশরূপে দেয়া হয়নি। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

হাফিয বায়হাকী (র) . . . . আবদুল্লাহ ইবন উনাইস এর বরাতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে খায়বার অভিযানে বের হয়েছিলাম। আমার সাথে ছিল আমার গর্ভবতী স্ত্রী। রাস্তায় তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় । আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে এ সংবাদ দিলে তিনি তখন আমাকে বললেন, তার জন্যে খেজুর ভিজিয়ে রাখ, যখন ভাল করে ভিজবে তখন তাকে সে পানি পান করতে বল। সে অনুরূপ করল। ফলে পরবর্তীতে সে কোন প্রকার অসুবিধার সম্মুখীন হয়নি। যখন আমরা খায়বার জয় করলাম হুযূর (সা) মহিলাদেরকে কিছু দান করলেন। তিনি তাদেরকে গনীমতের পূর্ণ অংশ প্রদান করেন নাই। আমার স্ত্রী ও সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকেও কিছু উপহারস্বরূপ দেওয়া হল। রাবী আবদুস সালাম বলেন, সন্তানটি ছেলে ছিল না মেয়ে, তা আমার জানা নেই।

জাফর ইবন আবু তালিব ও হাবশায় হিজরতকারী মুসলমানদের প্রত্যাগমণের বিবরণ

বুখারী (র) বলেন, মুহাম্মাদ ইবনুল আ’লা– আবু মূসা আশআরী (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “আমরা যখন ইয়ামানে ছিলাম তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির খবর আমাদের কাছে পৌঁছে। তাই আমরা তার কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পড়লাম । আমার আরো দুইজন ভাই ছিল । তাদের একজনের নাম আবূ বুরদাহ্ এবং অন্য জনের নাম আবূ রুহম। আমি ছিলাম সকলের ছোট। আমরা ৫২ জন কিংবা ৫৩ জন একই সম্প্রদায়ের লোক ছিলাম। আমরা নৌযানে আরোহণ করলাম। নৌযানে আমরা হাবশার । বর্তমান ইথিওপিয়ার) নাজ্জাশী বাদশাহর দরবারে পৌঁছলাম। আমরা জাফর ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করলাম ও তার সাথে দীর্ঘদিন সেখানে অবস্থান করলাম। পরে আমরা সকলে মিলে রওয়ানা হলাম এবং খায়বার বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে এসে মিলিত হলাম। কিছু সংখ্যক লোক আমাদের নৌযান আরোহীদেরকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন যে, আমরা তোমাদের পূর্বে হিজরত করেছি। আমাদের সাথে যারা পৌঁছলেন তাদের মধ্য হতে আসমা বিন্ত উমাইস (রা) একদিন উম্মুল মু’মিনীন হযরত হাফসা (রা)-এর ঘরে সাক্ষাতের জন্য গেলেন। নাজ্জাশীর দেশে হিজরতকারিণীদের মধ্যে আসমা (রা) ছিলেন অন্যতম । একদা উমর (রা) হাফসা (রা)-এর ঘরে ঢুকলেন তখন আসমা (রা) ছিলেন হাফসা (রা)-এর কাছে উপবিষ্ট। আসমাকে দেখে উমর (রা) বললেন, ইনি কে? হাফসা (রা) বলেন, “ইনি আসমা বিনতে উমাইসা (রা)।” উমর (রা) বললেন, এটা কি ঐ হাবশীয়া বাহরীয়া? (অর্থাৎ সমুদ্র পথে হাবশা ভ্রমণকারিণী)। আসমা (রা) বললেন, “জ্বী হ্যাঁ”। উমর (রা) বললেন, আমরা তোমাদের পূর্বে হিজরত করেছি। সুতরাং আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার। এ উক্তিতে আসমা রাগান্বিত হলেন এবং বললেন, “কখনও না, আল্লাহর শপথ, আপনারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে ছিলেন। তিনি আপনাদের মধ্যকার ক্ষুধার্তকে খাবার প্রদান করতেন এবং আপনাদের অজ্ঞদেরকে নসীহত করতেন। অন্যদিকে আমরা ছিলাম দূরতম অপরিচিত দেশ হাবশায়। আর এটা ছিল শুধুমাত্র আল্লাহ্ ও রাসূলের পথে সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আল্লাহর শপথ! আমি কোন কিছু পানাহার করব না যতক্ষণ না আপনি যা বলেছেন তা আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উত্থাপন করব, আমি তাকে তা’ জিজ্ঞেস করব। আল্লাহর শপথ! আমি মিথ্যা বলব না, বাক্যে কোন প্রকার তারতম্য করব না এবং অতিরিক্তও কিছু বলব না। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাশরীফ আঁনলেন। আসমা (রা) বললেন, হে আল্লাহর নবী (সা)! উমর (রা) এরূপ এরূপ বলেছেন। হুযূর (সা) বললেন : তুমি তাকে কী বলেছ? তিনি বললেন, আমি এরূপ এরূপ বলেছি। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের চেয়ে আমার কাছে অন্য কেউ বেশী হকদার বা প্রিয় নয়। তার এবং তার সাথীদের জন্যে হল একটি মাত্র হিজরত আর নৌযানে ভ্রমণকারী তোমাদের জন্যে হল দুটি হিজরত।” আসমা (রা) বলেন, “এরপর আবু মূসা আশআরী (রা) ও অন্যান্য নৌযান ভ্রমণকারীদের দেখলাম তারা দলে দলে আমার কাছে এসে এ কথোপকথন সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতেন। তাদের কাছে দুনিয়ার কোন জিনিসই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর এ উক্তির ন্যায় এত আনন্দদায়ক ও এত তাৎপর্যবহ ছিল না। আবু  বুরদা (রা) বলেন, “আসমা (রা) বলেছেন, আমি আবূ মূসা (রা)-কে দেখেছি, তিনি এ হাদীছটি বার বার আমার কাছ থেকে শুনতেন। আবূ বুরদা (রা), আবূ মূসা (রা)-এর বরাতে বলেন, নবী করীম (সা) বলেছেন, যখন রাত হয় তখন কুরআন তিলাওয়াতের আওয়ায দ্বারা আশআরী বন্ধুদের আওয়ায আমি চিনতে পারি এবং রাতের বেলায় কুরআন তিলাওয়াতের আওয়ায দ্বারা আমি তাদের ঘরবাড়ি চিনতে পারি যদিও আমি তাদের ঘরবাড়ি দিনের বেলায় দেখি নাই। তাদের মধ্যে একজন আছে হাকীম ইবন হিযাম । যখন সে দুশমনের মুকাবিলা করে তখন সে শত্রুকে বলে, নিশ্চয়ই আমার সংগীরা তোমাদেরকে মুকাবিলার আঘাত সহ্য করতে অপেক্ষা করার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছে।”

অনুরূপভাবে ইমাম মুসলিম আবু কুরায়ব এবং আবদুল্লাহ ইবন বারাদের মাধ্যমে আবু উসামা থেকে বর্ণনা করেন।

ইমাম বুখারী (র) ইসহাক ইবন ইবরাহীম– .. আবূ মূসা (র) সূত্রে বলেন । তিনি বলেছেন, “খায়বার বিজয়ের পর আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হলাম। তিনি আমাদেরকে অংশ দিলেন; কিন্তু আমাদের ব্যতীত অনুপস্থিত অন্য কাউকে অংশ প্রদান করেননি। উপরোক্ত বর্ণনাটি ইমাম বুখারী (র)-এর একক বর্ণনা । আবূ দাউদ (র) এবং তিরিমিযী (র)ও অনুরূপ বর্ণনা করেন ।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক উল্লেখ করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমর ইবন উমাইয়া আদ দিমারীকে নাজ্জাশীর কাছে প্রেরণ করে সাহাবায়ে কিরামের যারা এখনও সেখানে বাকী ছিলেন তাদেরকে ডেকে পাঠান । সুতরাং তারা জাফর (রা)-এর সাথে আগমন করেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার জয় করে ফেলেছেন। রাবী বলেন, সুফিয়ান ইবন উয়াইনা– আশ-শাবী (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “জাফর ইব্‌ন আবু তালিব (রা) খায়বার বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কপালে চুম্বন করেন ও তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, “আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, কোনটা আমার কাছে অধিক খুশীর বস্তু, খায়বার বিজয়, না কি জাফরের আগমন অনুরূপ সুফিয়ান ছাওরী— জাবির (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বার হতে মদীনায় আগমন করেন, তখন জাফর (রা)ও হাবশা হতে আগমন করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সাথে মুলাকাত করেন এবং তার কপালে চুম্বন করেন। আর বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি জানি না, দুয়ের মধ্যে কোনটা আমার কাছে অধিকতর খুশীর বিষয়, খায়বারের বিজয়, না কি জাফরের আগমন! এরপর ইমাম বায়হাকী (র)– জাবির (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, যখন জা’ফর ইবন আবু তালিব (রা) হাবশা থেকে আগমন করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করেন । যখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন, তখন তিনি তাঁর সম্মানার্থে এক পায়ে হাঁটতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর দু’ কপালে চুম্বন করেন। পুনরায় বাইহাকী (র) বলেন, উপরোক্ত হাদীছের সনদে এমন এক ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি সুফিয়ান ছাওরীর কাছে সুপরিচিত নন।

ইবন ইসহাক বলেন, মক্কাবাসীদের মধ্যকার যারা জাফর (রা)-এর সাথে খায়বার আগমনে বিলম্ব করেছিলেন তাঁরা ছিলেন ১৬ জন। তাদের ও তাদের স্ত্রীদের নাম নিম্নে বর্ণনা করা হল :

১. জাফর ইবন আবু তালিব আল-হাশিমী ও তাঁর স্ত্রী আসমা বিন্ত উমাইস (রা)। তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ্– যিনি হাবশায় জন্মগ্রহণ করেন।

২, খালিদ ইবন সাঈদ ইবন আল-আস ইবন উমাইয়া ইবন আবদে শামস (রা)। তার স্ত্রী উমাইনা [ইসাবা গ্রন্থে তাঁর নাম উমায়মা বলে উল্লেখ করা হয়েছে] বিন্ত খালফ ইবন সা’দ, তার পুত্র সাঈদ যিনি হাবশায় জন্মগ্রহণ করেন।

৩. তাঁর মাতা বিন্ত খালিদ, তার ভাই আমর ইবন সাঈদ (রা)।

৪. মু’আবঈব ইবন আবু ফাতিমা। তিনি সাঈদ ইবন আল-আস-এর পরিবারের সাথে ছিলেন।

৫. আবূ মূসা আল-আশআরী আবদুল্লাহ ইব্‌ন কায়স (রা), ইনি উতবা ইবন রাবীআর পরিবারের মিত্র ছিলেন ।

৬. আসওয়াদ ইবন নওফল ইবন খুয়ায়লিদ ইবন আসাদুল আসাদী

৭. জাহ্ম ইবন কায়স ইবন আবদু সুরাহবীল আল-আবদারী, তাঁর স্ত্রী উম্মু হারমালা বিন্ত আবদুল আসওয়াদ যিনি হাবশায় মারা যান। তার এক ছেলে আমর, এক মেয়ে খুযাইমা, দুজনই হাবশায় মারা যান।

৮. আমির ইবন আবু ওয়াক্কাস আয-যুহরী (রা)।

৯. উতবা ইবন মাসউদ (রা) হুযায়ল গোত্রের মিত্র।

১০. হারিছ ইবুন খালিদ ইবন সখর আত-তায়মী, তাঁর স্ত্রী রীতা বিনত হারিছ (রা)।

১১. উছমান ইবন রাবী’আ ইবন আহবান আল-জুমাহী।

১২. মাহমীয়া ইবন জুয যুবায়দী, বনূ ছাহমের মিত্র ।

১৩. মামার ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইবন নুদলা আল-আদয়ী । ১৪. আবূ হাতিব ইবন আমর ইবন আবদে শামস।

১৫. মালিক ইবন রাবীআ ইবন কায়স ইবন আবদে শামস আল-আমিরী, তাঁর স্ত্রী আমরাহ বিত সাদী (রা)।

১৬. হারিছ ইবন আবদু শামস ইবন লাকীত আল-ফিহরী (রা)।

গ্রন্থকার (র) বলেন, ইবন ইসহাক ঐ সকল আশআরীর নাম উল্লেখ করেননি যারা আবূ মূসা আল-আশআরী ও তার দুই ভাই আবু বুরদা ও আবু রুহম এবং তার চাচা আবু আমরের সাথে ছিলেন; বরং তিনি আবূ মূসা আল-আশআরী ব্যতীত অন্য কোন আশআরীর উল্লেখ করেননি, এমনকি তার চাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ তাঁর দুই ভাইয়েরও কোন উল্লেখ করেননি। অথচ সহীহ বুখারীতে তাঁদের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সম্ভবত ইবন ইসহাক এ সম্পর্কে আৰূ মূসা (রা)-এর হাদীছ সম্বন্ধে অবগত ছিলেন না। আল্লাহ্ তা’আলাই অধিক জ্ঞাত।

রাবী বলেন, দুটি জাহাজের মধ্যে তাদের সাথে ঐ মুসলিম মহিলারাও ছিলেন যাদের স্বামীগণ সেখানে ইনতিকাল করেছিলেন। ইমাম বুখারী (র) এ সম্পর্কে বহু চমৎকার তথ্য পরিবেশন করেছেন। তিনি বলেন, আমাদেরকে আলী ইবন আবদুল্লাহ্ (র)— আমবাসা ইবন  সাঈদ-এর সনদে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আবু হুরায়রা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে খায়বারের গনীমতের অংশ চাইলেন। তখন বনূ সাঈদ ইবন আলআশের এক ব্যক্তি বলল, ‘তাকে গনীমতের অংশ দেবেন না। তখন আবু হুরায়রা (রা) বলেন, “এ লোকটি প্রসিদ্ধ সাহাবী ইবন কূকালের হত্যাকারী।” তখন লোকটি বলল, “এ লিকলিকে সাপটির আগমনে আমি অবাক হচ্ছি। যাল নামক পর্বতের চূড়া হতে নেমে এসেছে। এটা বুখারী (র)-এর একক বর্ণনা।

বুখারী (রা) বলেন– আমবাসা ইবন সাঈদের বরাতে যুবায়দী (র) বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, “আবু হুরায়রা (রা) সাঈদ ইবনুল আসকে সংবাদ দেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা হতে নজদের দিকে আবানকে একটি অভিযানের দায়িত্ব দিয়ে পাঠালেন । আবু হুরায়রা (রা) বলেন, খায়বার জয়ের পর আবান এবং তাঁর সাথিগণ খায়বারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এসময় তাঁদের ঘোড়ার দড়ি ছিল খেজুরের পাতায় নির্মিত। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাদেরকে গনীমতের কোন অংশ দেবেন না।” আবান তখন বলে উঠলেন : “এ ব্যাপারে তুমি কেন কথা বলছ? হে খরগোস! তুমিত যাল নামক পর্বতের চূড়া হতে নেমে এসেছ।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “হে আবান, তুমি বসে পড়।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে কোন অংশ দিলেন না ।

এ হাদীছটি আবূ দাউদ (র)– যুবাইদী থেকে অনুরূপ বর্ণনা করেন।

এরপর ইমাম বুখারী (র)– সাঈদ ইবন আমর (রা)-এর সনদে বলেন, আবান ইবন সাঈদ (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আসলেন এবং সালাম দিলেন। আবু হুরায়রা (রা) বলে উঠলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ ব্যক্তিটিই ইবন কালের হত্যাকারী । আবান (রা) আবু হুরায়রা (রা)-কে বললেন, হে খেরগোস, তোমাকে নিয়ে অবাক হতে হয়, যাল নামক পর্বতের চূড়া হতে তুমি নেমে এসে ঐ লোকটির মৃত্যুর জন্যে তুমি আমাকে দায়ী ঠাওরাচ্ছো! অথচ আল্লাহ্ তা’আলা আমার হাতে তাঁকে শাহাদতের মর্যাদা দান করেছেন এবং আমাকে তার হাতে অপমানিত করার দায় থেকে রক্ষা করেছেন : ইমাম বুখারী (র) এককভাবে এ বর্ণনাটি পেশ করেছেন এবং জিহাদের অধ্যায়ে হুমায়দী (রা)-এর হাদীছ বর্ণনা করার পর আবূ হুরায়রা (রা)-এর বরাতে বলেন, অনুরূপ রিওয়ায়াত করেছেন। সুফিয়ান থেকেও— আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে অনুরূপ হাদীছ বর্ণিত রয়েছে। লক্ষণীয় যে, এ হাদীছের মধ্যে আবু হুরায়রা (রা) হতে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি খায়বার যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন না। এ অভিযানের বিবরণের শুরুতে তা উল্লেখ করা হয়েছে।

ইমাম আহমদ (র)– আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, খায়বার বিজয়ের পর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আগমন করেন এবং মুসলমানদের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলেন। তাতে মুসলমানগণ তাঁকে তাঁদের গনীমতের অংশে অন্তর্ভুক্ত করেন।

ইমাম আহমদ (র)– আম্মার ইব্‌ন আবু আম্মার (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যে যুদ্ধে গনীমত পাওয়া গিয়েছে এরূপ যে কোন যুদ্ধেই আমি অংশ নিয়েছি, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে গনীমতের অংশ দিয়েছেন। কিন্তু খায়বার যুদ্ধে দেন নাই। কেননা, হুদায়বিয়া

সন্ধিতে যারা উপস্থিত ছিলেন তাদেরই জন্যে খায়বারের গনীমত সংরক্ষিত ছিল।

গ্রন্থকার বলেন, “আবু হুরায়রা (রা) ও আবু মূসা (রা) হুদায়বিয়া ও খায়বারের মধ্যবর্তী সময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আগমন করেছিলেন। ইমাম বুখারী (র) আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ– আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা খায়বার জয় করি; কিন্তু আমরা তাতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের কোন গনীমত লাভ করিনি। আমরা গনীমত লাভ করেছি উট, গরু, আসবাবপত্র ও বাগ-বাগিচা। এরপর আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে ওয়াদিল কুরায় যাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা)–এর সাথে মিদ’আম নামক তার এক দাস ছিল। বনূ দাবীবের এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তা উপঢৌকন স্বরূপ দিয়েছিলেন। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উটের গদি নামাবার সময় একটি তীর এসে তার উপর পড়ল এবং সে তাতে মারা যায়। জনতা তাকে শহীদ জ্ঞানে অভিনন্দিত করল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, কখনও না। কেননা, খায়বারের দিন সে গনীমত বণ্টনের পূর্বেই একটি চাদর চুরি করেছিল। এ চাদরটি তার উপর আগুন ঝরাচ্ছে । একথা শোনার পর কেউ কেউ জুতার একটি ফিতা কিংবা দুটি ফিতা নিয়ে হাযির হয়ে বলতে লাগল, “এ জিনিসটি আমি নিয়েছিলাম।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “এটি জাহান্নামের একটি ফিতা বা দুইটি ফিতা।”

বিষ মিশ্রিত বকরীর ঘটনা ও নবুওয়াতের জলজ্যান্ত প্রমাণ

বুখারী (র) বলেন, উরওয়া (র) উম্মুল মু’মিনীন আইশা (রা)-এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হতে বর্ণনা করেছেন। অপর সনদে তিনি– আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, খায়বার বিজয় কালে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে একটি বিষ মিশ্রিত ভোনা বকরী হাদীয়া স্বরূপ দেওয়া হয়েছিল । এরূপে তিনি ঘটনাটির একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ পেশ করেন।

ইমাম আহমদ (র) হাজ্জাজ— আবূ হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, “যখন খায়বার বিজয় হয় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে একটি বিষ মিশ্রিত ভোনা বকরী হাদিয়া দেওয়া হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, এখানে যত ইয়াহূদী আছে সকলকে আমার কাছে ডেকে নিয়ে আস। তাদের সকলকে সমবেত করা হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমি তোমাদেরকে কিছু প্রশ্ন করব, তোমরা কি সত্য বলবে? তারা বলল, “হ্যাঁ, হে আকূল কাসিম!” রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বললেন, “তোমাদের পিতা কে? তারা বলল, অমুক আমাদের পিতা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমরা মিথ্যা বলেছ; বরং তোমাদের পিতা হচ্ছে অমুক ব্যক্তি। তারা বলল, “আপনি যথার্থ বলেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তোমরা কি আমার সাথে সত্য কথা বলবে, যদি আমি তোমাদেরকে আরো একটি কথা জিজ্ঞেস করি? তারা বলল, জ্বী হ্যাঁ হে আবুল কাসিম! আর আমরা যদি মিথ্যা বলি তাহলেও আপনি আমাদের মিথ্যা বুঝতে পারবেন। যেমন আমাদের পিতা সম্বন্ধে মিথ্যা উক্তিটি আপনি বুঝতে পেরেছেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “জাহান্নামের বাসিন্দা কারা? তারা বলল, আমরা কিছু দিনের জন্যে জাহান্নামে থাকব। এরপর আপনারা । রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বললেন, আল্লাহর শপথ! আমরা কখনো তোমাদের পরে জাহান্নামে থাকবনা। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বললেন, “তোমরা কি আমার কাছে সত্য কথা বলবে যদি আমি তোমাদেরকে আরো একটি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি?” তারা বলল, জ্বী হ্যাঁ, হে আবুল কাসিম! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “এ বকরীতে কি তোমরা বিষ প্রয়োগ করেছ? তারা বলল, “জ্বী হ্যাঁ।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, কেন তোমরা এ কাজটি করতে গেলে?” তারা বলল, “আমরা এটা এ উদ্দেশ্যে করেছিলাম যে, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হয়ে থাকেন তাহলে আমরা আপনার কবল থেকে পরিত্রাণ পাব আর যদি আপনি সত্য নবী হয়ে থাকেন, তাহলে এটা আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।”

উপরোক্ত হাদীছটি ইমাম বুখারী (র) জিযূইয়া অধ্যায়ে আবদুল্লাহ ইবন ইউসুফ এবং মাগাযী অধ্যায়ে কুতায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন।

বায়হাকী (র) আবু আবদুল্লাহ হাফিয– আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “একজন ইয়াহুদী রমণী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে একটি বিষ মিশিষ্ট বকরী হাদিয়া স্বরূপ দিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাহাবীগণকে বললেন, “এটা খাওয়া থেকে বিরত থাক। কেননা, এটাতে বিষ মিশ্রিত রয়েছে। এবং রমণীটিকে বললেন, “তুমি কেন এটা করতে গেলে? রমণীটি বলল, “আমি আপনাকে পরীক্ষার মাধ্যমে জানবার ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম। যদি আপনি সত্য সত্য নবী হয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে এ ব্যাপারে সংবাদ দেবেন। আর যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন তাহলে আমি জনগণকে আপনার অনিষ্ট থেকে পরিত্রাণ পাবার ব্যবস্থা করতে পারবো। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে আর কিছু বললেন না ।

আবূ দাঊদ (র) ও ইমাম বায়হাকী (র) ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।

ইমাম আহমদ (র) শুরায়হ— ইবন আব্বাস (রা) সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেন। তবে এতে অতিরিক্ত আছে এরপর হতে যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন প্রকার বিষক্রিয়া অনুভব করতেন তখনই রক্ত মোক্ষণ করাতেন। একবার তিনি উমরা আদায়ের জন্যে বের হন। যখন তিনি ইহরাম বাঁধেন তখনই বিষের ক্রিয়া অনুভব করতে লাগলেন, তখন তিনি রক্ত মোক্ষণ করালেন। ইমাম আহমদ (র) এককভাবে এ বর্ণনাটি পেশ করেন।

ইমাম বুখারী ও মুসলিম শু’বা– আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “একজন য়াহূদী মহিলা একটি বিষমিশ্রিত বকরী সহকারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বকরীর গোশত খান এবং তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, “আমি চেয়েছিলাম আপনাকে হত্যা করার জন্যে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “আল্লাহ্ তাআলা কোন দিনও তোমাকে আমার উপর প্রভাব বিস্তার করতে দেবেন না। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, “আমরা কি তাকে হত্যা করব?” রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “না” আনাস (রা) বলেন, “আমি সব সময়ই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আলজিভে এ বিষক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতাম।

ইমাম আবূ দাঊদ (র) সুলায়মান ইব্‌ন দাঊদ– জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “খায়বারের একজন ইয়াহূদী মহিলা একটি ভুনা বকরীতে বিষ মিশায় ও পরে তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে হাদিয়া স্বরূপ পাঠায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি সামনের রানের গোশত নিলেন ও খেলেন এবং তাঁর সাহাবীরা কয়েকজন খেলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবাগণকে বললেন, “তোমরা হাত গুটিয়ে নাও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মহিলাটিকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে বললেন, “তুমি কি এ বকরীতে বিষ মিশিয়েছ?” য়াহদী মহিলাটি বলল, “আপনাকে কে এ সংবাদ দিল?” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “আমার হাতে যা আছে এটাই আমাকে সংবাদ দিয়েছে অর্থাৎ রানের গোশত।” মহিলাটি বলল ‘জী হা’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তুমি কেন এ কাজটি করতে গেলে?” মহিলাটি বলল, “আমি মনে করেছিলাম, আপনি যদি নবী হয়ে থাকেন তাহলে এ বিষ আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না আর যদি নবী না হয়ে থাকেন তাহলে আমরা আপনার অনিষ্ট থেকে অব্যাহতি অর্জন করব।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ মহিলাটিকে ক্ষমা করে দেন, তাকে কোন শাস্তি দেননি। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীদের মধ্যে যারা এ গোশত খেয়েছিলেন তাঁদের কেউ কেউ মৃত্যু মুখে পতিত হন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিষ মিশ্রিত বকরী খাওয়ায় পিঠের উপরিভাগ থেকে রক্ত মোক্ষণ করান। এক সাহাবী আবৃ হিন্দ (রা), একটি ছুরি ও সিংগার সাহায্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রক্ত মোক্ষণ করেন। তিনি ছিলেন আনসারের বনূ বায়াদার একজন আযাদকৃত দাস।

এরপর আবু দাউদ (র) ওহব ইবন বাকিয়্যা– আবু সালামা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “খায়বারে এক ইয়াহুদী মহিলা একটি ভুনা বকবী হাদিয়া স্বরূপ প্রেরণ করেছিলেন। বাকী হাদীছ পূর্বরূপ জাবিরের হাদীছের ন্যায় বর্ণনা করেন। এরপর আবু সালামা (রা) বলেন, এরপর বিশর ইবন বারা ইবন মা’রূর (রা)-এর বিষক্রিয়ায় ইন্তিকাল করেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াহুদী মহিলার কাছে লোক প্রেরণ করেন ও তাকে বলেন, “তুমি এ কাজটি কেন করলে?” এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) এ মহিলাটিকে হত্যা করার হুকুম দিয়েছিলেন। এ হাদীছে রক্ত মোক্ষণের কোন উল্লেখ নেই।

বায়হাকী (র)— আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, “প্রথমে মহিলাটিকে হত্যা হয়ত করা হয়নি। এরপর যখন বিশর ইবন বারা ইনতিকাল করেন তখন তাকে হত্যা করার হুকুম দেওয়া হয়।

বায়হাকী (র)– আবদুর রহমান ইবন কা’ব ইবন মালিক (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, একজন ইয়াহূদী মহিলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে খায়বারে একটি ভুনা বকরী হাদিয়া প্রেরণ করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি?” সে বলল, “হাদিয়া।” সে সাদকা

বলার ব্যাপারে সতর্ক ছিল, কেননা, তাহলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) খাবেন না। রাবী বলেন, “এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ তা থেকে খেলেন। এরপর তিনি বলেন, খাওয়া থেকে বিরত থাক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মহিলাটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি বিষ মিশ্রিত করেছ?” মহিলাটি বলল, “আপনাকে কে এ সংবাদটি দিল?” তিনি বললেন, এ হাড়টি, যা তার হাতে ছিল । মহিলাটি বলল, “জী হা”। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “কেন?” মহিলাটি বলল, আমি ইচ্ছে করেছিলাম যে, যদি আপনি মিথ্যুক হন তাহলে আমরা আপনার উপদ্রব থেকে পরিত্রাণ পাব। আর যদি আপনি সত্যিকার নবী হন তাহলে এটা আপনার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। রাবী বলেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) পিঠের উপরিভাগ থেকে রক্ত মোক্ষণ করান এবং সাহাবায়ে কিরামকেও এরূপ করতে হুকুম দেন। সাহাবায়ে কিরামও রক্ত মোক্ষণ করান। তবে তাদের একজন মারা যান। যুহরী (র) বলেন, “মহিলাটি পরে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) মহিলাটিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।

ইবন লাহীয়াহ– যুহরী (র) হতে উল্লেখ করেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার জয় করলেন যারা নিহত হওয়ার তারা নিহত হলেন। যয়নাব বিনৃত হারিছ ইয়াহূদী মহিলা সাফিয়্যা (রা)-কে একটি বিষ মিশ্রিত ভুনা বকরী হাদিয়া পাঠাল । মহিলাটি ছিল খায়বারের বীর মারহাবের ভাতিজী। সে সামনের রানে বেশী বিষ মিশ্রিত করেছিল, কেননা, সে জেনে নিয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সামনের পায়ের গোশত বেশী পসন্দ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা)-এর ঘরে ঢুকলেন তাঁর সাথে ছিলেন বিশর ইবন বারা ইব্‌ন মা’রূর। তিনি ছিলেন বনু সালামার একজন। তাঁদের কাছে ভুনা বকরীটি পেশ করা হল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সামনের পায়ের রান থেকে দাঁত দিয়ে কিছু গোশত কেটে খেলেন । বিশুর (রা)ও একটি হাড় নিলেন এবং তার থেকে দাঁত দিয়ে কিছু গোশত খেলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন লুকমাটি গিলে ফেলেন বিশর ইবন বারাও তার মুখে যা ছিল তা গিলে ফেললেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন, তোমরা খাওয়া থেকে বিরত থাক। বকরীর টুকরাটি আমাকে সংবাদ দিচ্ছে যে, এটার মধ্যে মৃত্যু নিহিত রয়েছে। বিশর ইবন আল বারা (রা) বলেন, “ঐ সত্তার শপথ, যিনি আপনাকে মর্যাদা দান করেছেন আমি আমার খাবারের মধ্যে এটা টের পেয়েছিলাম, কিন্তু আমি আমার খাবার এ ভয়ে ফেলে দেইনি যে, হয়ত এতে আপনি বিরক্তিবোধ করবেন। এরপর আপনার মুখে যা ছিল তা আপনি গিলে ফেললে আমি তা থেকে বিরত থাকতে পারিনি, যদিও আমি চেয়েছিলাম যে আপনি যেন তা না গিলেন, যার মধ্যে মৃত্যু নিহিত রয়েছে। বিগ্র (রা) নিজ স্থান থেকে উঠে দাঁড়াতে পারলেন না, তার গায়ের রং সবুজ চাদরের আকার ধারণ করল। [বাংলা পরিভাষায় বিষক্রিয়ার প্রভাবকে ‘নীল’বলা হলেও আরবী পরিভাষায় ‘খাযর’ বা সবুজ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।–সম্পাদকদ্বয়।] তাঁর ব্যথা আর তাকে বেশী সময় দিলনা । তিনি যেন আর নড়াচড়া করতে পারছেন না এবং তিনি ঢলে পড়লেন।

যুহরী বলেন, জাবির (রা) বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঐদিন রক্ত মোক্ষণ করান। বনূ বায়াদা এর একজন দাস তাঁকে ছুরি ও সিংগার সাহায্যে রক্ত মোক্ষণ করেন । এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তিন বছর জীবিত ছিলেন। আর এ ব্যথায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন । তিনি বলতেন, খায়বারের দিন আমি যে বকরীটির গোশত খেয়েছিলাম তার ব্যথা আমি প্রায়ই অনুভব করতাম এমনকি মৃত্যুর সময় এর কারণে যেন আমার হৃদয় হতে শোণিত স্রোতোবাহী ধমনীটি ছিঁড়ে গেছে। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) শাহাদতের মৃত্যুবরণ করেন ।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক (র) বলেন, খায়বারের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) জয়লাভ করে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন, তখন সাল্লাম ইবন মিশকামের স্ত্রী যয়নাব বিন্ত হারিছ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে একটি ভুনা বকরী হাদিয়া স্বরূপ প্রেরণ করল। বকরীর কোন অংশটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট অধিকতর প্রিয় সে তা জানতে চেয়েছিল। তখন তাকে বলা হয়েছিল সামনের পায়ের রান। তাই সে তাতে বেশী বিষ মিশ্রিত করেছিল। এরপর গোটা বকরীতে বিষ মিশ্রিত করল এবং তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে আসল। যখন সে বকরীটি তার সামনে রাখল তখন তিনি সামনের পায়ের রানটি উঠিয়ে তার থেকে এক টুকরা চিবালেন; কিন্তু তা গিললেন না। আর তাঁর সাথে ছিলেন বিশর ইবন বারা ইবন মারূর। তিনিও তারই মত বকরীর সামনের পায়ের রান থেকে কিছু গোশত নিলেন, তবে বিশর (রা) তা গিলে ফেললেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা মুখ থেকে ফেলে দিয়ে বললেন, এ হাড়টি আমাকে সংবাদ দিচ্ছে যে, তার মধ্যে বিষ মিশ্রিত করা হয়েছে। এরপর মহিলাটিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করায় সে তা স্বীকার করল । তিনি বললেন, “তুমি এ কাজটি কেন করলে?” মহিলাটি বলল, “আমার সম্প্রদায়ের মধ্যে আমার মর্যাদা সম্পর্কে আপনি জানেন। তাই একজন নেত্রী হিসাবে আমি ইচ্ছে পোষণ করেছিলাম যে, যদি আপনি মিথ্যাবাদী হন, তাহলে আমি আপনার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাব। আর যদি আপনি সত্যি সত্যি নবী হন তাহলে আপনাকে এ ব্যাপারে সংবাদ দেয়া হবে। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে ক্ষমা করে দেন। আর বিশর (রা) বকরীর গোশত খাওয়ার কারণে ইনতিকাল করেন।

ইবন ইসহাক বলেন, মারওয়ান ইবন উছমান ইব্‌ন আবু সাঈদ আল-মুয়াল্লাহ তাকে বলেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে রোগ শয্যায় মৃত্যুবরণ করেন তথায় বিশর ইবন বারা ইবন মা’রূর এর ভগ্নি উপস্থিত হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “ হে বিশরের বোন! এ মুহূর্তে আমি বোধ করতেছি যে, খায়বারে তোমার ভাইয়ের সাথে যে বকরীর গোশত খেয়েছিলাম তার কারণে যেন, আমার ধমনী ছিঁড়ে গেছে।” রাবী বলেন, মুসলমানগণ বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা) আল্লাহ্ প্রদত্ত নবুওয়াতের সুমহান মর্যাদার সাথে সাথে এভাবে শাহাদতের মর্যাদাও লাভ করেছিলেন।

হাফিয আবু বকর আল-বাযযার (র) হিলাল ইব্‌ন বিশর– আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) সূত্রেও ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। এতে অতিরিক্ত আছে এরপর তিনি হাত বাড়ালেন এবং সকলকে বললেন, “আল্লাহর নামে খাও।” রাবী বলেন, আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে খেলাম । আমাদের কারো কোন ক্ষতি হয় নাই।

গ্রন্থকার বলেন, এ বর্ণনায় বেশ কিছু বিরল ও অগ্রহণযোগ্য ব্যাপার রয়েছে। আল্লাহ্ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।

ওয়াকিদী উল্লেখ করেন, উয়ায়না ইবন হিসৃন মুসলমান হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার অবরোধ করে রয়েছেন স্বপ্ন দেখে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করার আশা পোষণ করছিল । যখন সে খায়বারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আগমন করল তখন দেখল যে, তিনি খায়বার জয় করে ফেলেছেন । সে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমার মিত্র খায়বারবাসীদের কাছ থেকে তুমি যে গনীমত অর্জন করেছ তা আমাকে দিয়ে দাও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বললেন, তোমার স্বপ্ন তোমাকে প্রতারিত করেছে। সে যা দেখেছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার বর্ণনা পেশ করেন। এরপর উয়ায়না ফিরে যায়। তখন হারিছ ইবন আউফের সাথে তার সাক্ষাত হল! হারিছ বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, “তুমি ভুল করছ। আল্লাহর শপথ! মুহাম্মাদ পূর্ব দিগন্ত হতে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত জয় করবেন। ইয়াহূদীরা আমাদেরকে পূর্বে এ ব্যাপারে তথ্য দিয়েছে। তাই আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমি আবু রাফি সাল্লাম ইব্ন আকূল হুকাইককে বলতে শুনেছি। সে বলেছে, “আমরা নবুওয়াতের ব্যাপারে মুহাম্মাদকে হিংসা করছি। কেননা, তাঁর মাধ্যমে হারূন (আ)-এর বংশ থেকে নবুওয়াত বের হয়ে গেল। তিনি নিশ্চয়ই একজন প্রেরিত মহাপুরুষ। আর ইয়াহূদীরা এ ব্যাপারে আমার কথা মান্য করছে না। আমাদের জন্যে তাঁর পক্ষ হতে দুটি হত্যাযজ্ঞ রয়েছে- একটি ইয়াছরিবে এবং অপরটি খায়বারে।” হারিছ বলেন, আমি সাল্লামকে আরো বললাম, তিনি কি গোটা ভূ-খণ্ডের অধিপতি হবেন? সে বলল, “হ্যাঁ, যে তাওরাত মূসা (আ)-এর উপর নাযিল হয়েছে এটা তারই বাণী, তবে আমি চাইনা যে ইয়াহূদীরা এ বিষয়ে আমার এ বক্তব্য অবগত হোক।

সালাত কাযা হওয়ার ঘটনা

ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বার বিজয় সম্পন্ন করলেন তখন ওয়াদি কুরার দিকে অগ্রসর হলেন এবং সেখানকার বাসিন্দাদেরকে কয়েক রাত অবরোধ করে রাখলেন । এরপর তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। ইবন ইসহাক মিআমের ঘটনা বর্ণনা করেন। কেমন করে বিক্ষিপ্ত তীর তার গায়ে লেগেছিল এবং সে নিহত হলো। জনগণ বলতে লাগল তার জন্যে শাহাদত শুভ হোক । রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, কখনো না । যে সত্তার হাতে আমার জান, তাঁর শপথ করে বলছি, খায়বারের দিন গনীমত বিতরণের পূর্বে একটি চাদর গোপন করেছিল। এটার দরুন তার উপর অগ্নি প্রজ্বলিত হতে থাকবে।

বুখারীতে ইব্‌ন ইসহাকের অনুরূপ বর্ণনা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। আল্লাহ্ অধিক পরিজ্ঞাত।

ইমাম আহমদ (র)– যায়িদ ইবন খালিদ আল-জুহানী (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণের মধ্য হতে আশজা গোত্রের এক ব্যক্তি খায়বারের দিন নিহত হয়। এ সম্বন্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অবগত করা হলে তিনি বলেন, তোমাদের সাথীর জন্যে তোমরাই জানাযার সালাত আদায় করো। তাতে অনেকেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন। হুযূর (সা) বললেন, তোমাদের এ সাথীটি আল্লাহর সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। আমরা তার বিছানাপত্র তল্লাশী করলাম। তার মধ্যে ইয়াহুদীদের একটি হার পাওয়া গেল যার মূল্য ছিল মাত্র দুই দিরহাম । আবু দাঊদ (র) এবং ইমাম নাসাঈ (র)ও ইয়াহয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তানের মাধ্যমে অনুরূপ বর্ণনা করেন।

ইমাম বায়হাকী (র) উল্লেখ করেন যে, খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে বনূ ফাযারা মনস্থ করল এবং এজন্যে তারা সৈন্য সমাবেশ করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ সম্পর্কে অবগত হয়ে একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে মুকাবিলার জন্যে নিজেদের প্রস্তুতি সম্পর্কে সংবাদ জানাবার জন্যে একজন দূত পাঠালেন। যখন তারা মুসলমানদের প্রস্তুতি সম্পর্কে নিশ্চিত হল তখন তারা যে যেভাবে পারল পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল।

ইমাম বায়হাকী (র) আরো বলেন যে, মদীনার পথে সাদুস-সাবা নামক এক জায়গায় যখন হযরত সাফিয়্যা (রা) পবিত্রতা অর্জন করলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাথে বাসর করলেন, হাইস দ্বারা ওলীমা করলেন এবং সেখানে তার সাথে তিন রাত্রি যাপন করলেন । হযরত সাফিয়্যা (রা) মুসলমান হলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আযাদ করে দিলেন। তাঁকে বিয়ে করলেন এবং তার মুক্তিকে মোহরানা সাব্যস্ত করলেন। তিনি যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সফর সংগী ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে নিজের পিছনে বসিয়ে দেন এবং তার জন্যে পর্দার ব্যবস্থা করে দেন। এতে মুসলমানগণ বুঝতে পারলেন যে, তিনি তখন একজন উম্মুল মু’মিনীন ।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক তার সীরাত গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেন যে, খায়বার কিংবা খায়বারের পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা)-এর সাথে বাসর করলেন, আনাস বিন মালিক (রা)-এর মাতা উম্মে সুলায়ম বি মিলহান (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্যে সাফিয়্যা (রা) কে সাজান, চুল আঁচড়িয়ে দেন ও বেশভূষায় সজ্জিত করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে নিয়ে একটি তাবুতে রাত যাপন করেন। আবু আইয়ুব আনসারী (রা) তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সারারাত পাহারা দেন। ভোরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাকে তার জায়গায় দেখলেন তখন তিনি বললেন, হে আবূ আইয়ুব! কী ব্যাপার? তিনি বললেন, এ মহিলা সম্পর্কে আপনার ব্যাপারে আমি শঙ্কিত ছিলাম । কেননা, আপনি তার পিতা, স্বামী ও তার সম্প্রদায়কে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আর তিনি অল্প কদিন আগেও অমুসলিম ছিলেন এজন্য আমি শঙ্কিত ছিলাম। সাহাবায়ে কিরাম (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, হে আল্লাহ্! আপনি আবু আইয়ুবকে হিফাযত করুন যেভাবে তিনি রাত জেগে জেগে আমাকে হিফাযত করেছেন।

এরপর মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, সাঈদ ইবন মুসাইয়ি (র)-এর বরাতে যুহরী (র) আমাকে খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় ফজরের সালাত আদায় ব্যতীত সাহাবায়ে কিরামের নিদ্রায় মগ্ন হয়ে পড়ার বিষয়টি আমাকে অবহিত করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ই সর্বপ্রথম সজাগ হন এবং বলেন, হে বিলাল, “তুমি কী করলে? “ বিলাল (রা) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! যে ন্দ্রিা আপনাকে কাবু করেছে তা আমাকেও কাবু করে ফেলেছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “তুমি যথার্থই বলেছ”। এরপর কিছুক্ষণ আবার উট হাঁকানো হল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) অবতরণ করলেন, উযূ করলেন এবং যথারীতি ফজরের সালাত আদায় করলেন।

এ হাদীছটি যুহরী হতে ইমাম মালিক (র) ও অন্য সনদে মুরসাল রূপে বর্ণনা করেছেন।

আবূ দাউদ (র) ও–আবু হুরায়রা (রা)-এর বরাতে এ ঘটনাটি অনুঘটিত বর্ণনা করেন, তাতে অতিরিক্ত আছে; সালাত সমাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : অর্থাৎ যদি কেউ কোন সালাত পড়তে ভুলে যায় তাহলে যখনই স্মরণ হবে তখনই সে তা আদায় করে নেবে। কেননা, আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনুল কারীমে ইরশাদ করেন : ১২u Lal 31, অর্থাৎ আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর। (২০ তাহা : ১৪)

মুসলিম (র) ও– আবদুল্লাহ্ ইবন ওহাব হতে অনুরূপ বর্ণনা করেন এবং এ বর্ণনায়ও খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় এ ঘটনাটি ঘটেছে বলে উল্লেখ রয়েছে।

শুবা (র)– ইবন মাসউদ (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আসলে এ ঘটনাটি ঘটেছিল হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের সময়। আর বিলাল (রা)-ই পাহারায় রত ছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। অপর বর্ণনায় আছে, এ ঘটনায় পাহারারত ছিলেন ইবন মাসউদ (রা) নিজে।

উপরোক্ত বিরোধ নিরসনকল্পে ইমাম বায়হাকী (র) বলেন, এরূপ ঘটনা দুই বারও ঘটে থাকতে পারে ।

ওয়াকিদী আবু কাতাদা (রা)-এর বরাতে বলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম তাবুক যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় এ ঘটনাটি ঘটে। জা’ফর ইবন সুলায়মান— ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, সাহাবায়ে কিরাম তাবুক হতে প্রত্যাবর্তনের সময় এ ঘটনা ঘটে।

এরপর বায়হাকী (র) সালাত আদায়ের পূর্বে নিদ্রায় মগ্ন হওয়ার বিষয়ে আওফ নামী এক বেদুঈন ও এক মহিলার ঘটনা বর্ণনা করেন এবং কেমন করে পূর্ণ সেনাদল এ দুজন থেকে পানি সংগ্রহ করে তৃপ্তি সহকারে পানি পান করেছিল অথচ তাদের দুজনের পানি একটুও হ্রাস পায়নি তাও উল্লেখ করেন। পুনরায় তিনি মুসলিম বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করেন। এর মধ্যে সালাত আদায় না করে ন্দ্রিায় মগ্ন থাকা ও উযূর পাত্রে পানি বৃদ্ধি পাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। আবদুর রায্যাক মামার-কাতাদা সূত্রেও এটি বর্ণনা করেছেন।

বুখারী (রা)– আবু মূসা আল-আশআরী (রা)-এর বরাতে বলেন, তিনি বলেছেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার অভিযানে বের হলেন এবং তোকজন একটি ময়দানের নিকটবর্তী হলেন তখন তারা উচ্চস্বরে আল্লাহু আকবর, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ধ্বনি দিতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমরা তোমাদের নিজেদের প্রতি সদয় হও, তোমরা কোন বধিরকে কিংবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছ না। তোমরা যাকে ডাকছ তিনি সর্বশ্রোতা এবং তিনি নিকটেই, তিনি তোমাদের সাথেই আছেন। রাবী বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাওয়ারার পিছনে ছিলাম। তিনি আমাকে বলতে শুনলেন, আমি বলছিলাম এL । ১, ২, ৩, অর্থাৎ কারো কোন শক্তি সামর্থ নেই আল্লাহ প্রদত্ত তওফীক ব্যতীত। তিনি আমাকে বললেন, হে আবদুল্লাহ ইবন কায়স! আমি বললাম, আমি উপস্থিত হে আল্লাহর রাসূল! রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “আমি কি তোমাকে এমন একটি কথা বলব, যা জান্নাতের একটি গুপ্ত ভাণ্ডার?” আমি বললাম, “জ্বী হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার জন্যে আমার পিতা ও মাতা কুরবান হোন! তিনি বললেন, তা হচ্ছে : اقوة الا بالله

অন্যান্যরাও– আবূ মূসা (রা) হতে এ রিওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেছেন। তবে বিশুদ্ধ মতে, এ ঘটনাটি খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তন করার সময় ঘটেছিল । কেননা, আবূ মূসা (রা) খায়বার বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। যেমনটি পূর্বেই বলা হয়েছে।

ইবন ইসহাক বলেন, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় যে, খায়বার বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইবন লাকীম আল-আবসী (রা)-কে কিছু গৃহপালিত হাঁস-মুরগী দান করেন। সফর মাসে খায়বার বিজয় হয়েছিল। ইবন লাকীম খায়বার বিজয় সম্বন্ধে নিম্নোক্ত কবিতাগুলো রচনা করেন এবং বলেন,

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর তরফ থেকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বহু সংখ্যক সাহসী ও দক্ষ সৈন্য কর্তৃক নাতাত দুর্গ আক্রমণ করা হল। যখন আমি মুসলিম সৈন্যদের আগমনের কথা শুনলাম তখন খায়বার পতনের ব্যাপারে সুনিশ্চিত হলাম। সৈন্যদলের মাঝখানে ছিল আসলাম ও গিফার গোত্রের লোকজন । আমর ইবন যুর ‘আ গোত্রের লোকজনের সন্নিকটে মুসলিম সেনাদলের রাত পোহাল । আশ-শাক দুর্গটির বাসিন্দারা ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে দিনের আলো সত্ত্বেও অন্ধকার দেখতে লাগল । খায়বারের বিস্তীর্ণ এলাকার পতন ঘটাল মুসলিম সেনাদল এবং তা তারা দখল করে নিলেন। আর গৃহপালিত মুরগী ছাড়া ভোর বেলায় আর কোন শব্দই পাওয়া যাচ্ছিল না। আবদুল আশহাল কিংবা বনূ নাজ্জার এবং মুহাজির সেনাদল প্রতিটি দুর্গ অবরোধ করে নিল। তারা লোহার বর্ম পরিহিত থাকায় নিজেদেরকে সুরক্ষিত ভেবে পলায়নের কোন কল্পনাই করেননি। খায়বারবাসীরা বুঝতে পারল যে, মুহাম্মাদ (সা) নিশ্চয়ই বিজয় লাভ করবেন এবং খায়বারের পতন অনিবার্য। যুদ্ধক্ষেত্রে ইয়াহূদীরা এরূপ অবস্থা দেখে ভিড়ের মধ্যে সংগোপনে ও অনেকের অলক্ষ্যে পলায়ন করল ।

খায়বারের শহীদগণ

যেসব সাহাবী খায়বারে শাহাদতবরণ করেন, ইবন ইসহাক প্রমুখের বর্ণনা অনুযায়ী নিম্নে তাদের নামের তালিকা প্রদত্ত হলো ।

মুহাজিরের মধ্যে : বনু উমাইয়ার আযাদকৃত দাস রাবী’আ ইবন আকছাম ইব্‌ন সাখবারা আল-আসাদী (রা), বনু উমাইয়ার মিত্র সাকীফ ইবন আমর (রা) এবং রিফাআ ইবন মাসরূহ্ (রা), বনু আসাদের মিত্র ও তাদের বোনের ছেলে, সা’দ ইবন লায়ছ গোত্রের আবদুল্লাহ্ ইবন হুবায়ব ইিবন উহাইব ইবন সুহাইম ইবন গাবারা (রা)]।

আনসারদের মধ্যে : বিশর ইবন আল-বারা ইবন মা’রূর (রা)। যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বিষ মিশ্রিত বকরীর গোশত খাওয়ার পর শাহাদত বরণ করেন। ফুযায়ল ইবন নুমান তাঁরা উভয়েই সুলায়ম গোত্রের লোক ছিল । মাসঊদ ইবন সাদ (ইবন কায়স ইবন খালিদ ইবন আমির ইবন যুরায়ক আয় যুরাকী (রা), মাহমূদ ইবন মাসলামা আল-আশহালী (রা), আবূ যীয়াহ্ হারিছা

ইবন ছাবিত ইবন নুমান আল-আমরী (রা), হারিছ ইব্ন হাতিব (রা), উরওয়া ইবন মুররা ইবন সুরাকা (রা), আউস আল-ফারিদ (রা), আনীফ ইবন হাবীব (রা), ছাবিত ইব্‌ন আসলা (রা), তালহা (রা), আমারা ইবন উকবা (রা) (তীর নিক্ষিপ্ত হওয়ায় শহীদ), আমির ইবন আকওয়া (রা), সালামা ইবন আমর ইবন আকওয়া (রা) (হাঁটুতে নিজ তরবারীর আঘাত লাগায় নিহত), রাখাল সাহাবী আসওদ (রা) যার বিবরণ শুধু ইবন ইসহাক পেশ করেছেন।

ইবন ইসহাক আরো বলেন, খায়বারে শাহাদত বরণকারী যাদের কথা ইবন শিহাব যুহরী উল্লেখ করেছেন তারা হচ্ছেন : বনূ যুহার মাসউদ ইব্‌ন রাবীআ (রা), আনসারদের মধ্যে : আমর ইবন আউফ গোত্রের আওস ইবন কাতাদা (রা)।

হাজ্জাজ ইবন ইলাত আল-বাহযী (রা)-এর ঘটনা

ইবন ইসহাক বলেন, খায়বার বিজয়ের পর হাজ্জাজ ইবন ইলাত আস-সালামী আল-বাহযী বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আবু তালহার কন্যা আমার স্ত্রী উম্মু শায়বার কাছে মক্কায় আমার প্রচুর সম্পদ গচ্ছিত রয়েছে। আবার স্ত্রীর কাছে রয়েছে স্বীয় সন্তান মুওয়াওয়ায ইবন হাজ্জাজ । আর মক্কার ব্যবসায়ীদের কাছে রয়েছে আমার পাওনা বিভিন্ন ধরনের মালপত্র। সুতরাং আমাকে অনুমতি দেন আমি যেন আমার সম্পদ তাদের থেকে উদ্ধার করতে পারি । এ ব্যাপারে হয়ত আমার কিছু ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়ার দরকার হতে পারে । এরূপ করার অনুমতি আমাকে দিন! রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে সে অনুমতি দিলেন। হাজ্জাজ বলেন, এরপর আমি বেরিয়ে পড়লাম এবং মক্কার আল-বাইদা পাহাড়ের ঘাঁটিতে পৌঁছে দেখি কুরায়শের কিছু সংখ্যক লোক খবর সংগ্রহের জন্যে জড় হয়ে রয়েছে। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা) সম্বন্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন করছে। তবে তারা জানতো যে, তিনি খায়বার অভিযানে বের হয়েছেন। আর তারা এটাও জানতো যে, খায়বার হিজাযের একটি সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চল, ধনে জনে ও প্রতিরক্ষায় সুরক্ষিত এলাকা। তারা আরোহীদের থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছিল। তারা যখন আমাকে দেখতে পেল তখন সমস্বরে বলতে লাগল এ যে হাজ্জাজ ইবন ইলাত তারা তখনো আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে অবগত ছিল না । আল্লাহর শপথ, তার কাছে সঠিক ও সর্বশেষ সংবাদ পাওয়া যাবে। হে আবু মুহাম্মাদ, আমাদেরকে বল দেখি, আমরা জানতে পারলাম যে, পিতৃ পুরুষের ধর্মত্যাগী মুহাম্মাদ খায়বার অভিযানে বের হয়েছে। এটাত ইয়াহূদীদের শহর এবং হিজাযের কৃষি অঞ্চল। হাজ্জাজ বলেন, আমি বললাম, আমিও তা জানতে পেরেছি। তবে আমার কাছে এমন সংবাদ আছে যা শুনলে তোমরা অত্যন্ত খুশী হবে । হাজ্জাজ বলেন, তারা আমার উষ্ট্রির উভয় পার্শ্বে জড় হতে লাগল এবং ডাকতে লাগল, হে হাজ্জাজ বল, বল! হাজ্জাজ বলেন, আমি বললাম, “সে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে এধরনের পরাজয়ের কথা আর তোমরা কখনও শুন নাই। তার সাথীরা এমনভাবে নিহত হয়েছে যে, এরূপ হত্যার সংবাদ তোমরা কখনও শুন নাই। মুহাম্মাদকে বন্দী করা হয়েছে এবং তারা বলছে আমরা তাকে এখন হত্যা করবনা। আমরা তাকে মক্কায় পাঠাব যাতে মক্কাবাসীরা তাকে তাদের নিহত ব্যক্তিদের প্রতিশোধ হিসেবে সকলের সামনে হত্যা করতে পারে । হাজ্জাজ বলেন, এ সংবাদ শুনে তারা মক্কায় প্রত্যাবর্তন করল ও আনন্দে চিৎকার করতে লাগল এবং বলতে লাগল, তোমাদের কাছে সংবাদ রয়েছে যে- মুহাম্মাদের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি তাকে আমাদের সামনে আনা হবে এবং তাকে সকলের সম্মুখে হত্যা করা হবে। হাজ্জাজ বলেন, আমি তাদেরকে বললাম, মক্কায় অবস্থিত আমার সমুদয় সম্পদ সংগ্রহ করা এবং দেনাদারদের সাথে সাক্ষাত করার ব্যাপারে তোমরা আমাকে একটু সাহায্য কর। কেননা, আমি খায়বারে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের পূর্বে চলে যেতে চাই যাতে মুহাম্মাদ ও তার সঙ্গীদের পরিত্যক্ত সম্পদ আমি অন্যান্য ব্যবসায়ীদের আগেই খরিদ করতে পারি। হাজ্জাজ বলেন, তারা সকলে তৎপর হল এবং আমার সম্পদ একত্রিত করার ব্যাপারে তারা আমার প্রভূত সাহায্য করল। হাজ্জাজ বলেন, আমি আমার অমুসলিম স্ত্রীর কাছে আসলাম, তার কাছে আমার বহু সম্পদ গচ্ছিত ছিল। তাকে বললাম, আমার সম্পদগুলো আমাকে অতিসত্বর দাও। যাতে করে আমি খায়বার গিয়ে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের পূর্বেই মালপত্র খরিদ করতে পারি । হাজ্জাজ বলেন, যখন আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব এই খবর শুনতে পেলেন, তখন আমার কাছে ছুটে আসলেন এবং আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন । আমি ব্যবসায়ীদের একটি তাবুতে অবস্থান করছিলাম। তিনি বললেন, “হে হাজ্জাজ, তুমি কী খবর নিয়ে এলে?” তাঁকে আমি বললাম, “আমি যা আপনার কাছে বলব তা আপনি গোপন রাখতে পারবেন?” তিনি বললেন, “হ্যা” । এরপর হাজ্জাজ বলেন, আপনি একটু দেরী করুন, আমি আপনার সাথে নির্জনে দেখা করব ও কথাবার্তা বলব । আপনিতো দেখতেই পাচ্ছেন এখন আমি আমার সম্পদ সংগ্রহে ব্যস্ত রয়েছি। তিনি চলে গেলেন এবং আমি আমার সমস্ত সম্পদ সংগ্রহের কাজ সমাপ্ত করে ফিরে যেতে মনস্থ করলাম। তখন আমি আব্বাস (রা)-এর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং বললাম, হে আবুল ফযল! আমি যা বলব, আপনাকে তা তিনদিন পর্যন্ত গোপন রাখতে হবে। কেননা, আমার ধরা পড়ে যাওয়ার আশংকা আছে। তিনদিন পর আপনার যা ইচ্ছে বলুন। তিনি বললেন, ঠিক আছে, তুমি বল! আমি বললাম, আল্লাহর শপথ, আমি আপনার ভ্রাতুস্পুত্রকে তাদের রাজকন্যা সাফিয়্যা বিন্ত হুয়াইর বর হিসেবে দেখে এসেছি। তিনি খায়বার জয় করেছেন, দুর্গসমূহে যা কিছু ছিল তিনি বের করে নিয়েছেন এবং সমূদয় সম্পদ তাঁর ও তাঁর সাহাবীগণের আয়ত্তে এসে গেছে। আব্বাস (রা) বললেন, তুমি কি ঠিক বলছ হে হাজ্জাজ? তিনি বললেন, আমি বললাম, হ্যাঁ আল্লাহর শপথ! তবে এটা গোপন রাখবেন। আমি ইতোমধ্যে মুসলমান হয়ে গেছি। আর এখানে এসেছি শুধু আমার সম্পদগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্যে। এরপর তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। আবার বলে গেলেন, আল্লাহর শপথ, যখন তিনদিন চলে যাবে, তখন আপনি যেভাবে পসন্দ ব্যক্ত করতে পারেন। হাজ্জাজ বলেন, যখন তৃতীয় দিন এল, আব্বাস (রা) এক জোড়া নতুন কাপড় গায়ে সুগন্ধি মেখে একটি লাঠি হাতে কাবা শরীফে এসে তাওয়াফ করলেন। কুরায়শগণ যখন তাঁকে দেখতে পেয়ে বলে উঠল, “হে আবুল ফযল! আল্লাহর শপথ, এমন বিপদে এত ধৈর্য?” আব্বাস (রা) জবাব দিলেন, “কখনও না, তোমরা যে আল্লাহর শপথ করেছ, তার শপথ করে আমি বলছিঃ মুহাম্মাদ (সা) খায়বার জয় করেছেন এবং তাদের রাজকন্যার বর রূপে বাসর উদযাপন করেছেন। তাদের সম্পদ দখল করে নিয়েছেন। আর এখন সমগ্র সম্পদ তার ও তার সাহাবীদের আয়ত্তে এসে গেছে। তারা বলল, কে তোমাকে এ খবর দিয়েছে? তিনি বললেন, তোমাদেরকে যে খবর দিয়েছিল সে আবার আমাকে এ খবর দিয়েছে। সে তোমাদের এখানে মুসলমান হয়ে এসেছিল তার মালপত্র উদ্ধারের জন্যে। সে এখন মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীদের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে চলে গেছে। সে তার সাথেই থাকবে। তারা বলতে লাগল, আল্লাহর বান্দাদের সাহায্যে এগিয়ে আসুন। আল্লাহর দুশমন পালিয়ে গেছে। তবে আল্লাহর শপথ, যদি আমরা তার সম্বন্ধে জানতাম তাহলে তার ও আমাদের মধ্যে অনেক কিছু হয়ে যেত। হাজ্জাজ বলেন, তারা কিছুদিনের মধ্যে এ সম্বন্ধে বিস্তারিত সংবাদ পেয়ে গেল। এরূপে ইবন ইসহাক এ ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণনা করেন। অবশ্য ইমাম আহমদ পূর্ণ সনদসহ ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন যা নিম্নরূপ : তাতে অতিরিক্ত আছে- হাজ্জাজ বলেন, এ খবর মক্কায় প্রচারিত হলে মুসলমানগণ চুপচাপ হয়ে গেলেন আর মুশরিকগণ আনন্দফুর্তি করতে লাগল । হাজ্জাজ বলেন, এ খবর আব্বাস (রা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি মর্মাহত হলেন এমনকি দাঁড়াতেও পারলেন না। মামার (রা) বলেন, আমাকে– মিকসাম (র) সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, আব্বাস (রা) তার কুছাম নামী এক সন্তানকে চিৎ হয়ে বুকের উপর রাখলেন এবং কবিতার ছন্দে বলতে লাগলেন, কুছাম আমার আদরের সন্তান, সুঘ্রাণযুক্ত নাসিকার প্রতীক, সে আমার সন্তান, ধারণাকারীর ধারণায় সে ঐশ্বর্যশালী।

ছাবিত (রা) আনাস (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এরপর আব্বাস (রা) তার একটি গোলামকে হাজ্জাজ ইবন ইলাতের কাছে বলে পাঠালেন, সর্বনাশ তুমি এ কী সংবাদ নিয়ে এসেছ, আল্লাহ্ তা’আলা যা ওয়াদা করেছেন তা তোমার আনীত সংবাদ হতে উত্তম । হাজ্জাজ ইবন ইলাত গোলামটিকে বললেন, আকূল ফযলকে আমার সালাম দেবে এবং বলবে তার বাড়ির কোন একটি জায়গা যেন খালি করে রাখেন। কেননা, আমি তার কাছে কিছু গোপন কথা বলব যা তাঁকে আনন্দ দেবে। গোলামটি ফিরে গিয়ে বলল, হে আবুল ফযল, সুসংবাদ গ্রহণ করুন। হাজ্জাজ বলেন, এটা শুনে আব্বাস (রা) খুশীতে লাফ দিয়ে উঠলেন এবং গোলামের কপালে চুমু খেলেন। হাজ্জাজ যা বলেছিলেন গোলামটি তা হুবহু তার পুনরাবৃত্তি করল । তখন আব্বাস (রা) গোলামটিকে আযাদ করে দিলেন। এরপর আব্বাস (রা)-এর কাছে হাজ্জাজ আসলেন এবং সংবাদ দিলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার জয় করার পর গনীমত হিসেবে সমুদয় সম্পদ লাভ করেছেন এবং তাদের সম্পদে আল্লাহ্ তা’আলার অংশও নির্ধারিত করেছেন। আর রাসূলুল্লাহ (সা) সাফিয়্যা বিত হুয়াইকে নিজের জন্যে রেখে দিয়েছেন। তিনি তাঁকে আযাদ করে দিয়ে ইখতিয়ার দিয়েছেন যে, তিনি ইচ্ছে করলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্ত্রী হতে পারেন কিংবা নিজের পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হতে পারেন । কিন্তু তিনি আযাদ হবার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্ত্রী হওয়াকেই পছন্দ করেছেন। হাজ্জাজ বলেন, কিন্তু আমি এখানে আমার সম্পদ সংগ্রহের জন্যে এসেছি যাতে আমি এগুলো নিয়ে যেতে পারি। আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে অনুমতি নিয়েছি যেন, প্রয়োজনে যা ইচ্ছে তা বলতে পারি। আপনি এ সংবাদটি তিনদিন গোপন রাখবেন । এরপর যেভাবে ইচ্ছে তা প্রকাশ করতে পারেন। হাজ্জাজ বলেন, আসবাবপত্র, সোনারূপা যা তাঁর স্ত্রীর কাছে ছিল তা সে একত্র করে হাজ্জাজকে অর্পণ করল। এরপর তিনি এগুলো নিয়ে দ্রুত প্রত্যাবর্তন করলেন। যখন তিনদিন শেষ হল আব্বাস (রা) হাজ্জাজের স্ত্রীর নিকট আগমন করলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার স্বামী কী করেছে?” তখন সে সংবাদ দিল যে, তার স্বামী অমুক দিন চলে গেছে। আর বলল, “হে আবুল ফযল, তোমাকে যেন আল্লাহ্ চিন্তিত না করেন । তোমার কাছে যে সংবাদ পৌঁছেছে এটা আমাদেরকেও আহত করেছে।” আব্বাস (রা) বলেন, “হ্যাঁ, আল্লাহ যেন আমাকে চিন্তাযুক্ত না করেন। তবে আল্লাহর প্রশংসা এজন্যে যে, আমি যা পছন্দ করেছিলাম তাই হয়েছে। আল্লাহ্ তাঁর রাসূলকে খায়বারে বিজয় দান করেছেন। তথায় তাদের যমীনে আল্লাহর তা’আলার অংশ নির্ধারিত করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা)-কে নিজের জন্যে পছন্দ করেছেন । তোমার ইচ্ছে হলে তুমি তোমার স্বামীর সাথে গিয়ে মিলিত হতে পার।” মহিলা বলেন, “আমার ধারণা, আল্লাহর শপথ, তুমি সত্যবাদী।” তিনি বললেন, “হ্যাঁ, আমি সত্যবাদী। আমি যা সংবাদ দিয়েছি ব্যাপারটিও সত্য।” এরপর তিনি কুরায়শের বৈঠকখানায় গমন করেন। যখন তিনি তাদের অতিক্রম করছিলেন তখন তারা বলে, “হে আবুল ফযল, তুমি যেন সুখে থাক।” তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ্ তা’আলা আমাদেরকে সুখেই রেখেছেন। হাজ্জাজ ইবন ইলাত (রা) আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে খায়বারের বিজয় দান করেছেন এবং তিনি খায়বারে আল্লাহ্ তা’আলার অংশ নির্ধারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফিয়্যা (রা) কে নিজের জন্যে নির্বাচন করেছেন। সে আমাকে অনুরোধ করেছিল এ সংবাদটি যেন আমি তিনদিন পর্যন্ত গোপন রাখি। আর সে এসেছিল তার সম্পদ এবং এখানে যা কিছু আছে তা নিয়ে যাওয়ার জন্যে। তারপর সে চলে গেছে। রাবী বলেন, যে দুঃখক্লেশ মুসলমানদের ব্যথিত করছিল তা এবার মুশরিকদের অন্তরে বির্ধতে লাগল। মুসলমানদের যারা ঘরে লুকিয়ে ছিল, আব্বাস (রা) শুভ সংবাদ নিয়ে আসায় তারা ঘর থেকে বের হয়ে পড়লেন। মোট কথা, আব্বাস (রা) মুসলমানদের যে শুভ সংবাদ দিলেন তাতে মুসলমানগণ অত্যন্ত খুশী হলেন, মুসলমানদের যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট বেদনা মুশরিকদের অন্তরে গিয়ে বিদ্ধ হয়। উক্ত হাদীছটি নাসাঈ ব্যতীত সিহাহ্ সিত্তার অন্য কোন সংকলক রিওয়ায়াত করেননি। বায়হাকী (র) বিভিন্ন সনদে হাদীছটি বর্ণনা করেছেন।

অনুরূপ মূসা ইব্‌ন উকবা তাঁর মাগাযী গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, কুরায়শদের মধ্যে ছিল বেচা–কেনা ও জমি বন্ধক দেয়ার ও নেয়ার বড় প্রতিযোগিতা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাজি ধরেছিল যে, মুহাম্মাদ ও তাঁর সাহাবীগণ জয় লাভ করবে, আবার কেউ কেউ বলতেছিল যে, দুই মিত্রদল ও খায়বারের ইয়াহূদীরা জয় লাভ করবে । হাজ্জাজ ইব্‌ন ইলাত আস-সালামী ও আল-বাহী মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন এবং খায়বার বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। আবদুদ দার ইবন কুসাইর বংশের উম্মে শায়বা ছিল তাঁর স্ত্রী। হাজ্জাজ (রা) ছিলেন বিশাল সম্পদের মালিক, বনূ সুলায়মের যমীনের খনি তার মালিকানাধীন ছিল এবং রাসুলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বার বিজয় করলেন মক্কায় অবস্থিত তাঁর সমুদয় সম্পদ সংগ্রহের লক্ষ্যে মক্কা যাওয়ার জন্যে হাজ্জাজ রাসূলুল্লাহ্ (সা) হতে অনুমতি চান, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে অনুমতি দেন যেমন পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।

ইবন ইসহাক বলেন, খায়বারের যুদ্ধে কবি হাসান যে কবিত পাঠ করেছিলেন তার মধ্যে কয়েকটি নিম্নে প্রদত্ত হল ।

“খায়বারবাসীরা তাদের অর্জিত খেত খামার ও খেজুর বাগান রক্ষার জন্যে যে যুদ্ধ করেছিল তা ছিল অত্যন্ত খারাপ। কেননা, এটা ছিল ইসলামী সেনাদলের বিরুদ্ধে লড়াই। তারা ইসলামী সেনাদলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মৃত্যুবরণ করাকে অপসন্দ করেছিল। তাই তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল। আর তারা অপমানজনক মন্দ কাজ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল । তারা কি মৃত্যু থেকে পলায়ন করতে চায়? মৃত্যু অনিবার্য। তবে তাদের জানা উচিত যে, অপমানের মৃত্যু প্রশংসার যোগ্য নয়।”

ইবন হিশাম, আবু যায়দ আল-আনসারী (রা) হতে কা’ব ইবন মালিক রচিত নিম্নবর্ণিত যে, কবিতাগুলো উদ্ধৃত করেছেন তার মর্মার্থ নিম্নরূপ :

আমরা খায়বার ও তার আশে পাশের এলাকায় অবতরণ করলাম। আমাদের সাথে ছিলেন পাথেয় বিহীন সাহসী যুবদল, যারা প্রয়োজনে হন দানশীল ও শক্তিশালী এবং প্রতিটি যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুর উপর তড়িত গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, প্রতিটি শীত মৌসুমে বিরাট খাদ্য ভাণ্ডারের আয়োজক হন, তাঁরা উচ্চমান সম্পন্ন তরবারি পরিচালনায় বিশেষ পারদর্শী, তারা যে যুদ্ধে শাহাদত বরণের সুযোগ খুঁজে পান সে যুদ্ধকে সাফল্যরূপে অত্যন্ত প্রশংসার চোখে দেখেন। আল্লাহর কাছে তারা শাহাদতের আশা করেন এবং শাহাদতকে প্রশংসার যোগ্য ও সাফল্য মনে করেন, বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যে তাঁরা জীবনবাজি রাখেন এবং মুখে ও হাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ হতে শত্রুকে প্রতিরোধ করেন, প্রতিটি কাজের অনিষ্ট থেকে হিফাযত করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে তাঁরা সাহায্য সহায়তা করার জন্যে সর্বদা প্রস্তুত থাকেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবন রক্ষা করার জন্যে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আনীত অদৃশ্য খবরাখবরকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বিশ্বাস করেন এই উদ্দেশ্যে যাতে ভবিষ্যতের মান মর্যাদা, সফলতা রক্ষা পায়।

ওয়াদিল কুরায় গমন, ইয়াহুদীদেরকে অবরোধ ও তাদের সাথে সন্ধি স্থাপন

ওয়াকিদী বলেন, আবদুর রহমান ইবন আবদুল আযীয– আবূ হুরায়রা (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে খায়বার হতে ওয়াদিল কুরার দিকে বের হলাম। ইতোমধ্যে রিফাআ ইবন যায়দ ইবন ওহাব আল-যুমী রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে একটি কৃষ্ণকায় গোলাম হাদিয়া স্বরূপ দিয়েছিলেন যার নাম ছিল মিয়া’ম। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উটের গদী সাজাত। আমরা যখন ওয়াদিল কুরায় অবতরণ করলাম তখন আমরা ইয়াহূদী বসতির শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছলাম। আরবের কিছু সংখ্যক লোকও এখানে এসেছিল। ফলে মিদ’আম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গদি নামাচ্ছিল তখন আমরা সেখানে অব্যবহিত করে ইয়াহূদীরা আমাদেরকে তীর ছুঁড়ে অভ্যর্থনা জানাল । কিন্তু তাতে আমাদের কারো কোন ক্ষতি হয়নি। তারা তাদের দুর্গে উদ্ভট আওয়ায করছিল। হঠাৎ একটি বিক্ষিপ্ত তীর এসে মিদ’আমের গায়ে লাগল এবং সে নিহত হল। লোকজন বলতে লাগল, তার জন্যে জান্নাত শুভ হোক।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “কখনও না, যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! সে খায়বারের দিন গনীমতের মাল হতে সংগোপনে যে চাদরটি গনীমত বিতরণের পূর্বেই আত্মসাৎ করেছিল। এ চাদরটি তার জন্যে জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করবে।” রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাণী শুনামাত্রই তাঁর কাছে কিছু সংখ্যক সাহাবী জুতার একটি ফিতা বা দুটি ফিতা নিয়ে হাযির হতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, জাহান্নামের একটি ফিতা কিংবা দুটি ফিতা হচ্ছে এগুলো। এ হাদীছটি অন্যসনদে অনুরূপ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত রয়েছে।

ওয়াকিদী বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবায়ে কিরামকে যুদ্ধের জন্যে আহ্বান করলেনও তাদেরকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করালেন। সা’দ ইবন উবাদা (রা), হুবাব ইবন মুনযির (রা), তিনি আব্বদ ইবন বিশর (রা) এবং সাহল ইবন হনায়ফ (রা)-কে একটি করে পতাকা দিলেন। এরপর ওয়াদিল কুরাবাসীকে ইসলামের দিকে আনেন। শাসকদল এবং তাদের কাছে সংবাদ পৌঁছালেন যে, যদি তারা ইসলাম গ্রহণ করে, তাহলে তাদের জানমাল রক্ষা পাবে। আর তাদের পরকালের হিসাব রইবে আল্লাহর যিম্মায়।

রাবী বলেন, তারপর তাদের মধ্য থেকে একব্যক্তি দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্যে এগিয়ে আসল। তার মুকাবিলার জন্যে যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা) এগিয়ে আসেন ও তাকে হত্যা করেন। এরপর অন্য একজন দ্বন্দ্ব যুদ্ধের জন্যে এগিয়ে আসল । তার মুকাবিলায় আলী (রা) এগিয়ে গেলেন এবং তাকে হত্যা করলেন। এভাবে তাদের এগার জন নিহত হয়। তাদের মধ্য হতে একেক জন নিহত হওয়ার পর বাকীদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। ঐদিন সালাতের ওয়াক্ত সন্নিকট হওয়ায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবাগণকে নিয়ে সালাতের ওয়াক্তে সালাত আদায় করেন । পুনরায় তাদেরকে ইসলামের এবং আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি দাওয়াত প্রদান করা হয়। তারপর সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ চলে। এর পরদিন এক বর্শা পরিমাণ সূর্য উপরে না উঠতেই তারা আত্মসমর্পণ করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধের মাধ্যমে ওয়াদিল কুরা জয় করেন এবং আল্লাহ্ তা’আলা শত্রুদের সম্পদ, আসবাবপত্র ও প্রচুর ঐশ্বর্য গনীমত হিসাবে মুসলমানদেরকে দান করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ওয়াদিল কুরায় চারদিন অবস্থান করেন আর গনীমতের মালামাল সাহাবাগণের মধ্যে বণ্টন করেন। সেখানকার জমি-জমা ও খেজুর বাগান ইয়াহুদীদের হাতে থাকতে দেন এবং তাদের সাথে বর্গা চাষের অনুমতি দেন। তায়মা নামক স্থানের ইয়াহূদীরাও যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহিত খায়বার ফাদাক ও ওয়াদিল কুরার অধিবাসীদের সন্ধির কথা শুনল জিযিয়া আদায়ের চুক্তিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তারাও সন্ধি স্থাপন করল। তাদের সম্পদ তাদের হাতেই রয়ে গেল । হযরত উমর (রা)-এর যুগে তিনি খায়বার ও ফাদাকের ইয়াহুদীদেরকে বিতাড়িত করলেন । কিন্তু ওয়াদিল কুরা ও তায়মার ইয়াহূদীদেরকে তিনি তাদের নিজ এলাকায় থাকতে দিলেন। কেননা, তাদের এলাকা পড়েছে সিরিয়ায়। আর ওয়াদিল কুরা ব্যতীত মদীনার অন্যান্য এলাকা পড়েছে হিজাযে । হিজায ব্যতীত অন্যান্য এলাকা হচ্ছে সিরিয়ার অন্তর্গত । রাবী বলেন, খায়বারও ওয়াদিল কুরা জয় করার ও গনীমত লাভের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় ফেরত আসেন।

ওয়াকিদী বলেন, ইয়াকুব ইবন মুহাম্মাদ (র)– উম্মু আম্মারা (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জ্বরফ নামক জায়গায় আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, “সফর থেকে ফেরত আসার কালে ইশার সালাতের পর সংবাদ না দিয়ে তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের কাছে যেয়ো না।” রাবী বলেন, গোত্রের একজন লোক রাত্রি বেলায় তার স্ত্রীর কাছে প্রবেশ করল এবং তার অপসন্দনীয় জিনিস দেখতে পেল। এরপর সে তার থেকে পৃথক রইল; কিন্তু তাকে ছেড়ে গেল না। স্ত্রী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিল অথচ তার এ স্ত্রীর গর্ভে তার সন্তানাদি ছিল আর সে স্ত্রীকে ভালবাসত। বস্তুত সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদেশ অমান্য করায় অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হল ।

অধ্যায় : সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খায়বার জয় করেন তখন ইয়াহূদীদের সাথে এ শর্তে চুক্তি করেন যে, উৎপাদিত শস্য ও খেজুর বাগান থেকে তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে অর্ধেক প্রদান করবে। এ হাদীছে আরো উল্লেখ রয়েছে যে, তারা যাবতীয় সম্পদেও এরূপ চুক্তি করেছিল। আবার এটাও উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বলেছিলেন, যতদিন ইচ্ছে আমরা তোমাদেরকে থাকার অনুমতি দেব। সুনান গ্রন্থেসমূহে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফসল মূল্যায়নের সময় আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) কে প্রেরণ করতেন এবং তিনি তাদের অংশ নির্ধারণ করতেন। মূতার যুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা শাহাদত বরণ করলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) জাব্বার ইবন সখরকে এ কাজের জন্য প্রেরণ করতেন।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, আমি ইবন শিহাব যুহরী (রা)-কে জিজ্ঞেস করলাম যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের ইয়াহূদীদেরকে কিভাবে তাদের খেজুর বাগানগুলো অর্পণ করেছিলেন। তখন তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধের মাধ্যমে খায়বার জয় করেন। খায়বার এমন সম্পদের অন্তর্ভুক্ত ছিল যার মধ্য হতে আল্লাহ্ তা’আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এক-পঞ্চমাংশ দান করেছেন এবং বাকী অংশ মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করার তাওফীক দিয়েছেন। যুদ্ধের পর যাদেরকে বিতাড়িত করার প্রয়োজন ছিল তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়। তাদেরকে ডেকে এনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছিলেন, “যদি তোমরা চাও তাহলে এ শর্তে আমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে পার যে, উৎপাদিত ফল-ফসলাদি তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সমান সমান দুইভাগে বন্টন করা হবে । আর আমাদের যতদিন ইচ্ছে তোমাদেরকে আমরা এখানে থাকতে অনুমতি দেব । তারা এ প্রস্তাব মেনে নেয় এবং বর্গা চাষী হিসাবে এখানে অবস্থান করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-কে প্রেরণ করতেন এবং তিনি ন্যায্যভাবে ফল-ফসলাদি বন্টন করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের পর আবু বকর (রা) তাঁর ওফাত পর্যন্ত তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে যে চুক্তি হয়েছিল সে চুক্তি মুতাবিক থাকতে দেন। উমর (রা) ও তাঁর খিলাফতের প্রথমাংশে তাদেরকে পূর্বের ন্যায় থাকতে দেন; কিন্তু যখন এ হাদীছটি তাঁর নিকট পৌঁছল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) অন্তিম শয্যায় বলেছেন, “আরব উপদ্বীপে দু’ধর্ম একত্রে থাকবে না।” উমর (রা) এ হাদীছটি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে তা শুদ্ধ বলে তাঁর কাছে প্রমাণিত হয় । তখন তিনি ইয়াহূদীদের নিকট বলে পাঠালেন, “আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে বিতাড়িত করার জন্যে আমাকে অনুমতি দিয়েছেন এবং আমার কাছে এ হাদীছটি পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “আরব উপদ্বীপে দুটি ধর্ম একত্রে থাকবে না। কারো সংগে যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কোন অঙ্গীকার থাকে তাহলে সে যেন তা আমার কাছে এসে পেশ করে, আমি সে অঙ্গীকার পূরণ করব । আর যার কাছে এরূপ কোন ওয়াদা অঙ্গীকার নেই, সে যেন দেশত্যাগের জন্যে তৈরী হয়ে যায়। সুতরাং যাদের কাছে কোন অঙ্গীকার ছিল না তাদেরকে উমর (রা) দেশান্তরিত করলেন।

গ্রন্থকার বলেন, তিনশ’ বছর পর খায়বারের ইয়াহূদীরা দাবী করতে লাগল যে, তাদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর লিখিত একটি চুক্তিনামা আছে যাতে লিখা রয়েছে যে, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াহূদীদের থেকে জিযিয়া মওকুফ করে দিয়েছেন।” তথাকথিত এই চুক্তিনামার কারণে কিছু সংখ্যক আলিম প্রতারিত হয়ে মত প্রকাশ করেছেন যে, ইয়াহূদীদের উপর থেকে জিযিয়া রহিত করা হয়েছে।

ইমাম শাফিঈ (র)-এর অনুসারীদের মধ্যে এরূপ অভিমত অবলম্বনকারীদের অন্যতম হলেন শেখ আবু আলী ইবন খায়রুন । অথচ এই অঙ্গীকার নামাটি ভুয়া, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। একটি স্বতন্ত্র পুস্তকে এই তথাকথিত চুক্তি নামাটি ভুয়া হবার বিভিন্ন কারণ বর্ণনা করা হয়েছে ।

অনেক আলেম তাঁদের গ্রন্থাদিতে এ তথাকথিত অঙ্গীকারনামা নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করেছেন যেমন ইবনুস সাব্বাগ তার কিতাব মাসাইলে এবং শেখ আবু হামিদ তার ব্যাখ্যা গ্রন্থে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। ইবনুল মালামা এটা বাতিল প্রমাণ করার জন্যে একটি স্বতন্ত্র পুস্তিকা লিখেছেন । ইয়াহুদীরা সাতশ বছর পর এ নিয়ে আন্দোলন শুরু করে এবং একটি কিতাব প্রকাশ করে। যার মধ্যে তাদের তথাকথিত চুক্তিনামা সন্নিবেশিত রয়েছে। এটা সম্বন্ধে আমি যখন অবগত হলাম তখন এটা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখলাম যে, এটা মিথ্যা। কেননা, এ চুক্তিনামায় সা’দ ইবন মুআয (রা) সাক্ষী রয়েছেন। অথচ সা’দ ইব্‌ন মু’আয (রা) খায়বারের পূর্বেই ইনতিকাল করেছিলেন । এটার মধ্যে মু’আবিয়া ইবন আবু সুফিয়ানের সাক্ষ্য রয়েছে অথচ তিনি ঐ সময় মুসলমানই হননি। চুক্তি নামার শেষে লেখক রয়েছেন আলী ইবন আবু তালিব, এটাও ভুল। আর এটার মধ্যে জিযিয়া মওকুফের কথা আছে অথচ সে সময় জিযিয়ার প্রচলনই হয়নি। কেননা, এটা প্রথম যখন প্রবর্তন করা হয় তখন নাজরানবাসীদের থেকে তা প্রথম গ্রহণ করা হয়। ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেন যে, তারা ৯ম হিজরীর দিকে এসেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা অধিক জ্ঞাত।

অতঃপর ইবন ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উমর (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম নাফি আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, যুবায়র ইবনুল আওয়াম (রা), মিকদাদ ইবন আসওদ (রা) ও আমি খায়বারে অবস্থিত আমাদের সহায় সম্পদ দেখাশুনার জন্যে সেখানে গেলাম। আমরা যখন খায়বারে পৌঁছলাম তখন নিজ নিজ সম্পদের তত্ত্বাবধানে বের হলাম। তিনি বলেন, “আমি যখন আমার বিছানায় শুয়েছিলাম তখন আমার উপর হামলা করা হয়। এবং আমার দুটো হাতের কব্জি কনুই থেকে স্থানচ্যুত হয়ে যায় । আমি আমার সাথীদের লক্ষ্য করে জোরে চিৎকার করলে তারা আমার কাছে ছুটে আসলেন এবং আমাকে প্রশ্ন করলেন, কে তোমার এরূপ অবস্থা করেছে? আমি বললাম, আমি জানি না। তখন তারা আমার হাত ঠিক করে দিলেন এবং আমাকে উমর (রা)-এর নিকট নিয়ে আসলেন। তিনি তখন বললেন, “এটা খায়বারের ইয়াহুদীদের কারসাজি।” এরপর খুত্ব দেয়ার জন্যে জনগণের সামনে দাঁড়ালেন এবং বললেন, “উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী! আপনারা জানেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াহূদীদের সাথে এ শর্তে চুক্তি করেছিলেন যে, যখন আমরা চাইব তখন আমরা তাদেরকে বিতাড়িত করতে পারব । তারা আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা)-এর উপর যুলুম করেছে। তারা তার হাতগুলো মুচড়ে দিয়েছে। পূর্বেও তারা এক আনসারী ভাইয়ের উপর যুলুম করেছিল। এটা যে তাদের কারসাজি তাতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা, তারা ছাড়া সেখানে আমাদের কোন শত্রু নেই। যদি কারো খায়বারে কোন মাল পাওনা থাকে সে যেন তা আদায় করে নেয়; কেননা, আমি ইয়াহুদীদের বিতাড়িত করব। এরপর তিনি তাদেরকে বিতাড়িত করেন।’

খায়বারে উমর (রা)-এর অংশ ছিল তবে তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন এবং ওয়াকফে শর্ত রেখেছিলেন যার দিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইংগিত করেছেন। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে তার উল্লেখ রয়েছে। তিনি শর্ত করেছিলেন যে, ওয়াকফ সম্মতিতে নজরদারী করবেন তার ছেলে মেয়েদের মধ্যে সর্বাধিক পুণ্যবানরা ক্রমানুসারে ।

হাফিয বায়হাকী তাঁর দালায়েল গ্রন্থে বলেন, “খায়বার বিজয়ের পর ও উমরাতুল কার মধ্যবর্তী সময়ে কয়েকটি ক্ষুদ্র অভিযানের বর্ণনা সন্নিবেশিত হয়েছে যদিও কোন কোনটির সুনির্দিষ্ট তারিখ সম্পর্কে যুদ্ধ সংক্রান্ত ইতিহাসবেত্তাদের কাছে স্পষ্ট নয়।

বনূ ফাযারা-এর প্রতি আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর অভিযান

ইমাম আহমদ (র)— সালামা (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা আবূ বকর ইবন আবু কুহাফা (রা)-এর সাথে বের হলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আমাদের আমীর নিযুক্ত করেন। আমরা বনু ফাযারার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলাম। আমরা যখন জলাশয়ের নিকটবর্তী হলাম, তখন আবু বকর (রা)-এর নির্দেশে আমরা শুয়ে পড়লাম। এরপর যখন আমরা ফজরের সালাত আদায় করলাম তখন আবূ বকর (রা)-এর হুকুমে আমরা আক্রমণ করলাম। যারা আমাদের দিকে পানির জন্যে আসতেছিল তাদেরকে হত্যা করলাম। রাবী (সালামা) বলেন, ‘অতঃপর আমি তাকিয়ে দেখলাম লোকজন তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে পাহাড়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আমি তাদের পিছু নিলাম। আমি আশংকা করলাম তারা আমার পূর্বে পাহাড়ে পৌঁছে যাবে ও হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই আমি তাদের দিকে তীর নিক্ষেপ করতে লাগলাম। তীর গিয়ে তাদের এবং পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গায় পড়ল। তাদের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে গেল। আমি তাদেরকে হাঁকিয়ে আবু বকর (রা)-এর নিকট জলাশয়ের নিকট নিয়ে আসলাম। তাদের মধ্যে ছিল ফাযারা গোত্রের একজন মহিলা। তাঁর মাথার উপরে ছিল চামড়ার একটি ভারী টুকরা। তার সাথে ছিল তার একটি অত্যন্ত সুন্দরী কন্যা। তার সুন্দরী কন্যাটিকে আবু বকর (রা) গনীমত হিসাবে আমাকে দান করেন। আমি তাকে উপভোগ না করেই মদীনায় পৌঁছলাম। এরপর আমি রাত যাপন করলাম; কিন্তু তখনও আমি তাকে উপভোগ করলাম না। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বাজারে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে বলেন, “হে সালামা! তুমি আমাকে মেয়েটি দিয়ে দাও। আমি বললাম, “আল্লাহর শপথ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! মেয়েটি আমার খুবই পসন্দ হয়েছে; কিন্তু এখনও আমি তাকে উপভোগ করিনি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিরুত্তর রইলেন এবং চলে গেলেন। পরদিন বাজারে আবার রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে আমার সাক্ষাত হয় । তিনি বললেন, হে সালামা! তুমি আমাকে মেয়েটি দিয়ে দাও। আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! মেয়েটি আমার খুব পসন্দ হয়েছে তবে আমি এখনও তাকে উপভোগ করিনি। আমার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) নিরুত্তর রইলেন এবং চলে গেলেন। পরদিন আবার তার সাথে বাজারে আমার দেখা হয়। তিনি বললেন, “হে সালামা! মেয়েটি আমাকে দান কর। আল্লাহ তোমার পিতার মঙ্গল করুন। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহর শপথ, আমি এখনও তাকে উপভোগ করিনি! ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সে এখন হতে আপনারই। রাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে মক্কাবাসীদের কাছে প্রেরণ করেন। তাদের হাতে ছিল বেশ কয়েকজন মুসলিম কয়েদী আটক। এ মহিলাটিকে তিনি তাদের মুক্তিপণ রূপে দান করলেন ও তাদের মুক্ত করে আনলেন। ইমাম মুসলিম এবং বায়হাকী এটি বর্ণনা করেছেন।

হযরত উমর (রা)-এর অভিযান

বায়হাকী (র) ওয়াকিদী (র)-এর বরাতে বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ত্রিশজন আরোহীসহ উমর (রা)-কে চার মাইল দূরে অবস্থিত তুরবা নামক জায়গায় অভিযানে প্রেরণ করেন। তার সাথে ছিল বনু হিলালের একজন পথপ্রদর্শক। তারা রাত্রে ভ্রমণ করতেন এবং দিনের বেলায় শত্রুর জন্যে ওৎপেতে থাকতেন। যখন তারা শত্রুর এলাকায় পৌঁছলেন তখন শত্রুরা পালিয়ে যায়। উমর (রা) মদীনায় ফিরে আসলেন। রাস্তায় তাঁকে কেউ কেউ বললেন, “আপনি কি খায়বার গোত্রের সাথে যুদ্ধ করবেন?” তিনি বললেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) শুধুমাত্র হাওয়াযিন গোত্রের বিরুদ্ধে তাদের এলাকায় আমাদেরকে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

ইয়াসীর ইবন রিযাম ইয়াহূদীর বিরুদ্ধে প্রেরিত আবদুল্লাহ ইবন

রাওয়াহার অভিযান বায়হাকী– যুহরী (র)-এর বরাতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ত্রিশজন আরোহীসহ আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-কে ইয়াসীর ইবন রিযাম ইয়াহূদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে প্রেরণ করেন। তাঁরা খায়বারে তার কাছে পৌঁছলেন । কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট সংবাদ পৌঁছে ছিল, সে বনূ গাতফানকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে সংঘবদ্ধ করছে। মুসলমানগণ ইয়াসীর ইবন রিযাম ইয়াহূদীর নিকট হাযির হয়ে যুদ্ধের কৌশল হিসেবে বললেন, আপনাকে খায়বারের শাসনকর্তা নিযুক্ত করার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে আপনার নিকট প্রেরণ করেছেন, মুসলিম সেনাদল তার সাথে অবস্থান করেন । শেষ পর্যন্ত সে তার ত্রিশজন লোকসহ তাদের সংগী হল। প্রত্যেক মুসলমানের সংগে ছিল একজন কাফির সহযাত্রী। যখন তারা খায়বারের ১০ কিলোমিটার দূরে ‘কারকারাহনিয়ার নামক স্থানে পৌঁছলেন তখন ইয়াসীর ইবন রিযাম সংকোচবোধ করতে লাগল। সে তার হাত দ্বারা আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর তলোওয়ারের দিকে ইংগিত করল। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) তার কুমতলব আঁচ করতে পেরে তার উটকে দ্রুত চালাতে লাগলেন। এরপর তিনি উপস্থিত সকলকে সামনের দিকে পরিচালিত করতে লাগলেন। তিনি ইয়াসীর এর পায়ে আঘাত করে তা কেটে ফেলেন । ইয়াসীরও পাল্টা আঘাত করল। তার হাতে ছিল শাওহাত নামী শক্ত কাঠের বেলচা। এটা দিয়ে সে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর চোখে মুখে আঘাত করল এবং তাঁকে মারাত্মকভাবে আহত করল। প্রত্যেক মুসলমান তার সহযাত্রীর উপর আক্রমণ চালাল এবং তাদের একজন ব্যতীত প্রত্যেককে হত্যা করা হল। সে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। মুসলমানদের কেউই নিহত হননি। মদীনায় ফেরত আসার পর রাসূলুল্লাহ (সা) আবদুল্লাহ্ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর আহত স্থানে মুখের লালা লাগিয়ে দিলেন, ফলে তাতে পূজ সৃষ্টি হয়নি বা তার মৃত্যু পর্যন্ত এজন্য তাঁর কোন প্রকার কষ্টও অনুভূত হয়নি।

বাশীর ইবন সা’দ (রা)-এর অভিযান

ওয়াকিদী হতে সনদ সহকারে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ত্রিশজন আরোহীসহ বাশীর ইবন সা’দ (রা) কে ফাদাক ভূখণ্ডের মুররা গোত্রের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। তিনি তাদের পশুপালকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তারা তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং তার সাথে যারা ছিলেন তাদের সকলকে হত্যা করল । তিনি ঐ দিন অত্যন্ত ধৈর্য ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এরপর তিনি ফাদাকে আশ্রয় নিলেন এবং এক ইয়াহূদীর কাছে রাত্রিযাপন করেন। পরে তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

গালিব ইবন আবদুল্লাহ (রা)-এর অভিযান

ওয়াকিদী বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) গালিব ইবন আবদুল্লাহ (রা) কে কতিপয় প্রবীণ সাহাবী সহকারে বনূ মুররাহ জনপদে প্রেরণ করেন। ঐ সাহাবীগণের মধ্যে ছিলেন উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা), আবু মাসউদ আল-বারী (রা), কা’ব ইবন উজরা (রা) প্রমুখ।

ইউনুস ইবন বুকায়র– বনূ সালামার কিছু সংখ্যক বর্ণনাকারী হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) গালিব ইবন আবদুল্লাহ আল-কালবী (রা) কে বনূ মুররার বসতিতে প্রেরণ করেন। এ যুদ্ধে বনূ মুররার মিত্র মিরদাস ইবন নুহায়ক নিহত হয়। তাকে উসামা (রা) হত্যা করেন । ইবন ইসহাক— উসামা ইব্‌ন যায়দ (রা)-এর বরাতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমার একজন আনসারী ভাইও আমি হুরুকাতের এক ব্যক্তি মিরদাস ইবন নুহায়কের উপর হামলা করলাম । যখন তার উপর তলোয়ার চালনা করলাম ও তাকে হত্যা করতে উদ্যত হলাম । তখন সে বলল, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। তার পরেও আমি তাকে হত্যা করলাম। যখন আমরা মদীনায় পৌঁছলাম এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-কে এ সম্বন্ধে অবগত করলাম, তিনি বললেন, “হে উসামা! লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ বলার পরও তুমি কেন তাকে হত্যা করলে? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সে প্রাণ বাঁচাবার জন্যে এ কালিমা পড়েছে। তিনি বললেন, লা-ইলাহা বলার পরও তুমি যে তাকে হত্যা করলে তারপর তোমাকে কে রক্ষা করবে? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বার বার এ কথাটি উচ্চারণ করতে লাগলেন। আমার মনে হচ্ছিল যে, এতদিন মুসলমান না হয়ে আজকে আমার মুসলমান হওয়াটা ভাল ছিল । তাহলে আমিও তাকে হত্যা করতাম না। এরপর আমি বললাম, ‘আমি আল্লাহর কাছে অঙ্গীকার করছি যে, যে ব্যক্তি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করবে আমি কখনও এরূপ লোককে হত্যা করব না। তিনি বললেন, “আমার পরেও হে উসামা?” আমি বললাম, “জী হ্যাঁ, আপনার পরেও।”

ইমাম আহমদ (র)– উসামা ইবন যায়দ (রা)..এর বরাতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, জুহায়না সম্প্রদায়ের আল-হুঁরুকাত গোত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে প্রেরণ করলেন। আমরা শত্রুর ওখানে ভোর বেলায় পৌঁছলাম। তাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি ছিল সে যখন দলের অগ্রগামী থাকত তখন সে আমাদের দিকে সকলের চেয়ে বেশী দ্রুত অগ্রসর হতো আর যখন তারা পশ্চাদপসণন করত, তখন সে পিছনে থেকে তাদেরকে হিফাজত করত। তাই এক আনসারী ভাই ও আমি তার উপর হামলা চালালাম। তখন সে বলল, ‘লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোন মা’বুদ নেই । আনসারী তাকে হত্যা করা থেকে বিরত রইলেন; কিন্তু আমি তাকে হত্যা করলাম। আমরা মদীনায় পৌঁছলাম তখন এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পৌঁছল। তিনি বললেন, “হে উসামা! তুমি কি তাকে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলার পরও হত্যা করেছ?” আমি বললাম, “জী হা, ইয়া রাসূলাল্লাহ! সে তো কেবল হত্যা থেকে বাঁচার জন্যেই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ উচ্চারণ করেছিল। তারপরও রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে বললেন, তুমি কি তাকে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলার পর হত্যা করেছ?” এরূপে তিনি বারবার এ বাক্যটি বলতে থাকলেন। এতে আমি মনে করতে লাগলাম যে, যদি আগে মুসলমান না হয়ে ঐ দিনই মুসলমান হতাম তাহলে কতই না ভাল হত।

ইমাম বুখারী এবং মুসলিমও অনুরূপ হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

ইবন ইসহাক— জুনদুব ইবন মাকিস আল-জুহানী হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) গালিব ইবন আবদুল্লাহ আল-কালবী (রা) কে কাদীদে অবস্থানরত বন্‌-মানূহ এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে প্রেরণ করেন এবং তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনার জন্যে আদেশ দেন। আর আমি এ ক্ষুদ্র সৈন্যদলের একজন সদস্য ছিলাম। আমরা রওয়ানা হলাম এবং যখন আমরা কাদীদে পৌঁছলাম তখন হারিছ ইবন মালিক ইবন আল-বায়সা আল-লাইছীর সাথে সাক্ষাত করলাম। আমরা তাকে গ্রেফতার করলাম। সে বলল, আমি মুসলমান হওয়ার জন্যে এসেছি। গালিব ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) তাকে বললেন, যদি তুমি মুসলমান হওয়ার জন্যেই এসে থাক তাহলে এটাতে তোমার কোন ক্ষতি নেই যে, আমরা তোমাকে একদিন একরাত পর্যবেক্ষণে রাখব। আর যদি অন্য কোন উদ্দেশ্যে এসে থাক সে ব্যাপারে আমাদেরকে তোমার সম্পর্কে সুনিশ্চিত হতে হবে। রাবী বলেন, গালিব (রা) তাকে বেঁধে ওখানে রেখে দিলেন এবং কয়েকজন হাবশী লোককে তার সাথে রেখে গেলেন ও তাকে পাহারা দেবার জন্যে বললেন, আর যদি কোন প্রকার খিয়ানত করে তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দেবারও অনুমতি দিলেন। রাবী বলেন, “আমরা ‘বাতনে কাদীদ’ নামক স্থানে আসরের পর পৌঁছলাম। সেখানে অভিযান চালাবার জন্যে আমার সাথীরা আমাকে একটি টিলায় পৌঁছার লক্ষ্যে প্রেরণ করেন। আমিও টিলায় উঠার ইচ্ছা পোষণ করি যাতে করে আমি কারা পানি নিয়ে আসে তা প্রত্যক্ষ করতে পারি । টিলায় উঠে মুখ নিচের দিকে দিয়ে তথায় আমি শুয়ে পড়লাম । তখন ছিল সূর্যাস্তলগ্ন । শত্রুপক্ষের একজন লোক ঘর থেকে বের হয়ে আসল এবং আমাকে টিলার উপর নিচের দিকে মুখ করে শুইয়ে থাকতে দেখল; কিন্তু মানুষ বলে সে নিশ্চিত হতে পারলোনা। তাই সে তার স্ত্রীকে বলল, “আমি ঐ টিলার উপর যেন একটি মানুষের ছায়া দেখতে পাচ্ছি যা দিনের প্রথম ভাগে দেখি নাই লক্ষ্য কর, কোন কুকুরত নয় যা তোমার হাড়ি পাত্র থেকে কিছু খেয়ে নিয়েছে” মহিলাটি খোঁজ নিল এবং বলল, “না আমার কোন জিনিস হারানো যায়নি বা কোন কিছু কোন প্রাণী খেয়ে নিয়েছে বলেও মনে হচ্ছে না। লোকটি তার স্ত্রীকে একটি ধনুক ও কোষ হতে দুইটি তীর প্রদান করার জন্যে নির্দেশ দিল । মহিলাটি তার হাতে দুইটি তীর তুলে দিল। সে আমার পাঁজর লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করল, কিংবা রাবী বলেন, সে আমার কপাল লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করল। আমি তীরটি আমার শরীর থেকে বের করে নিলাম এবং পাশে রেখে দিলাম। আর কোন প্রকার নড়াচড়া করলাম না। এরপর সে আমার দিকে দ্বিতীয় তীরটি নিক্ষেপ করল এবং তা আমার বাহুতে বিদ্ধ হল । আমি এটাও খুলে নিলাম এবং পাশে রেখে দিলাম; কিন্তু কোন নড়াচড়া করলাম না। সে তার স্ত্রীকে বলল, আমার দুই দুইটি তীরই তাকে আঘাত করেছে। যদি কোন সন্দেহের বস্তু হত তাহলে অবশ্যই সে নড়াচড়া করত। যখন ভোর হবে তখন তুমি আমার তীরগুলো খোঁজ করে আনবে । কুকুরের জন্যে আমরা এগুলো অযথা ফেলে রাখব না। গালিব (রা) বলেন, “সে আমাকে প্রচুর সময় দিল। এমনকি যখন তাদের হৈচৈ থেমে গেল তারা দুধপান করল, মদ পান করল, নীরব হয়ে পড়ল এবং রাতের একাংশ কেটে গেল। তখন আমরা তাদের উপর আক্রমণ চালালাম। তাদেরকে হত্যা করলাম, তাদের পশুপালকে হাঁকিয়ে নিয়ে আসতে লাগলাম এবং আমরা এগুলো নিয়ে ফেরত আসার জন্যে রওয়ানা হলাম। এমন সময় বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তাদের সম্প্রদায়ের বাকী লোকজন আমাদের দিকে ছুটে আসল। রাবী বলেন, আমরা অতি দ্রুত দৌড়াতে লাগলাম। হারিছ ইবন মালিক ইবন আল-বারসা ও তার সাথীর সাক্ষাত পেলাম । তাকে আমাদের সাথে নিয়ে নিলাম। লোকজনের হৈচৈ আমাদের কানে পৌঁছতে লাগল। তারা এত অধিক সংখ্যায় আসছিল যে, তাদের মুকাবিলা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। যখন তাদের মধ্যেও আমাদের মধ্যে শুধুমাত্র কাদীদের উপত্যকার দূরত্ব বিরাজমান ছিল । তখন আল্লাহ্ তা’আলা পানির ঢল প্রেরণ করলেন। বর্তমানে কিংবা অতীতেও কোন প্রকার বৃষ্টির অস্তিত্ব দেখা যায়নি। পানির এ ঢলের জন্যে কেউ আর সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারল না। আমরা তাদেরকে থ’ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলাম। আর তারাও আমাদেরকে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখতে পেল। তারা শুধু আমাদের দিকে তাকিয়ে ছিল। সামনে অগ্রসর হওয়া কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। শত্রু পক্ষের জন্তু জানোয়ার ও অন্যান্য সম্পদসহ অন্যপথে দ্রুত রাস্তার দিকে আমরা অগ্রসর হলাম। শত্রুকে পিছনে ফেলে আমরা দ্রুত গতিতে মদীনায় চলে আসলাম ।  

আবূ দাউদ (র) গালিব ইবন আবদুল্লাহকে- আবদুল্লাহ ইবন গালিব বলে, বর্ণনা করেছেন তবে শুদ্ধ হল গালিব ইবন আবদুল্লাহ (রা)। ওয়াকিদী অন্য সনদেও এ হাদীছটি বর্ণনা করেছেন। তিনি তাতে গালিব ইবন আবদুল্লাহর সাথে ত্রিশজন সাহাবী থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।

বায়হাকী (র) ওয়াকিদীর বরাতে বাশীর ইবন সা’দের অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন। এ সৈন্যদলটি খায়বার সংলগ্ন এলাকায় প্রেরণ করা হয়েছিল। এ ক্ষুদ্রদলের সদস্যগণ আরবের একদল শত্রুর মুকাবিলা করেন এবং প্রচুর গনীমত লাভ করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর পরামর্শ অনুযায়ী বাশীর ইবন সা’দ (রা)-এর নেতৃত্বে তিনশত লোকের একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। হুসাইল ইবুন নাবীরা (রা) ছিলেন তাদের পথ প্রদর্শক। ওয়াকিদী বলেন, “তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ও খায়বারে পথ প্রদর্শক ছিলেন।

আবূ হাদরাদ (রা)-এর অভিযান

ইউনুস (র)– আবু হাদরাদ (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমার সম্প্রদায়ের একটি মহিলাকে আমি বিয়ে করলাম, তার মহর স্থির হয় দুইশ’ দিরহাম। আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে আমার বিয়ের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করলাম। তিনি বললেন, “মোহরানা কত দিচ্ছ?” আমি বললাম, “দুইশত দিরহাম।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “সুবাহানাল্লাহ, আল্লাহর শপথ, যদি তুমি তোমার কোন উপত্যকা থেকেও এ মহর নিতে পারতে তাহলেওতো তুমি তার থেকে বেশী মোহরানা দিতে পারতে না। আল্লাহর শপথ, বর্তমানে আমার কাছে এমন সম্পদ নেই যে তোমাকে আমি সাহায্য করতে পারি।” আবু হাদরাদ (রা) বলেন, “আমি কয়েকদিন অপেক্ষা করলাম। এরপর জিশাম ইবন মুআবিয়া নামী এক বড় গোত্রের এক ব্যক্তি, যার নাম ছিল রিফাআ ইব্‌ন কায়স অথবা কায়স ইবন রিফা’আ ও তার সাথীরা তার সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠিকে নিয়ে মাঠে নেমে সমাবেশ করে এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুতি নেয়। জিশাম গোত্রে সে ছিল অবস্থা সম্পন্ন ব্যক্তি ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। আবু হাদরাদ (রা) বলেন, “আল্লাহর রাসূল (সা) আমাকে ও আরো দুইজন মুসলমান ভাইকে ডাকলেন এবং নির্দেশ দিলেন, “তোমরা এ লোকটির খোঁজে যাও, তার সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে আস। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে একটি দুর্বল উষ্ট্রী দিলেন। এটার উপরে আমাদের একজন সওয়ার হল । দুর্বলতার কারণে সে তাঁকে নিয়ে হাঁটতে পারছিল না। লোকজন তাকে পিছন থেকে হাত দিয়ে ধাক্কা : দিচ্ছিল। পরে সে চলতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “এটার উপর চড়ে তোমরা গন্তব্য স্থলে পৌঁছবে। আবু হাদরাদ (রা) বলেন, “আমরা বের হয়ে পড়লাম । আমাদের সাথে ছিল আমাদের হাতিয়ার, তীর, বর্শা ও তলোয়ার । সূর্যাস্তের সময় আমরা উক্ত সমাবেশের নিকট পৌঁছলাম এবং একপার্শ্বে ওঁৎপেতে রইলাম। আমার অন্য দুই সাথীকে সমাবেশের অন্য দিকে ওঁৎপাতার জন্যে নির্দেশ দিলাম । আমি তাদেরকে বললাম, যখন তোমরা আমাকে তাকবীর বলতে শুনবে ও আক্রমণ করতে দেখবে তখন তোমরা তাকবীর বলবে ও আমার সাথে সাথে আক্রমণ করবে । আল্লাহর শপথ, আমরা যে কোন প্রকার সুযোগ পাবার জন্যে এরূপে অপেক্ষা করছিলাম । রাত নামার পরও আমরা অপেক্ষা করছিলাম এমনকি এশার অন্ধকার কিছুটা ঘনীভূত হতে লাগল। তাদের ছিল একটি রাখাল । সে কোন কাজে শহরে গিয়েছিল; কিন্তু ফিরে আসতে দেরী করছিল। তারা তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। রিফাআ ইব্‌ন কায়স উঠে দাঁড়াল। তার তলোয়ার ঘাড়ে ঝুলিয়ে নিল এবং বলল, আল্লাহর শপথ, আমি আমাদের রাখালের ব্যাপারটি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই। সে বোধ হয় কোন বিপদে পড়েছে। তার কয়েকজন সাথী বলল, “আল্লাহর শপথ, তুমি যাবেনা। আমরাই যথেষ্ট।” তখন সে বলল, “না, আমিই যাব।” তারা বলল, তাহলে আমরা তোমার সাথে যাব।” সে বলল, “আল্লাহর শপথ, তোমরা কেউ আমার সংগে আসবেনা।” একথা বলে সে একাকী বের হল। আবু হাদরাদ (রা) বলেন, “যখন সে আমার কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল এবং আমার পুরাপুরি নাগালে পৌঁছে গেল, তখন আমি তার বুকে তীর নিক্ষেপ করলাম। আল্লাহর শপথ, সে কোন কিছু উচ্চারণ করার পূর্বেই ঢলে পড়ল। এমনি সময় আমি তার দিকে লাফ দিয়ে গেলাম এবং তার মাথাটি কেটে ফেললাম। এরপর আমি তাকবীৰ দিলাম ও তাদের প্রতি আক্রমণ পরিচালনা করলাম। আমার সাথীদ্বয়ও তাকবীর বললেন এবং আক্রমণ পরিচালনা করলেন। আল্লাহর শপথ, এখানে যারা ছিল সকলেই তাদের কাছে যা কিছু সম্পদ ছিল তা নিয়ে ও পরিবার-পরিজন নিয়ে আত্মসমর্পণ করল। আমরা বড় বড় উষ্ট্রীও বহু বকরী হাঁকিয়ে নিয়ে আসলাম। আর গনীমতের মালামাল ও রিফাআ ইব্‌ন কায়সের কর্তিত মাথা নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হলাম। ঐসব উন্ত্রীর মধ্য হতে রাসূলুল্লাহ (সা) আমার মোহরানা আদায়ের জন্যে আমাকে তেরটি উষ্ট্ৰী দান করলেন। আমি মোহরানা আদায় করে আমার স্ত্রীকে ঘরে উঠিয়ে নিলাম।

মিহলাম ইবন জুছামা যে ক্ষুদ্র যুদ্ধে আমির ইবন আল-আহ্বাতকে হত্যা করেছিল

ইবন ইসহাক– আবু হাদরাদ (রা) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, “ রাসূলুল্লাহ (সা) কয়েকজন মুসলমানসহ আমাকে আযাম নামক স্থানে প্রেরণ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আৰু কাতাদা আল-হারিছ ইবন রিয়ী (রা) এবং মিহলাম ইবন জুছামা ইবন কায়স। আমরা যখন বাতনে আযাম নামক স্থানে পৌঁছলাম আমির ইবন আল-আহ্বাত ইবন আল-আশজায়ী’-এর সাথে আমাদের সাক্ষাত হল। তার সাথে ছিল একটি আসন এবং দুধের একটি বড় মশক। সে আমাদেরকে ইসলামী কায়দায় সালাম দিল। তাই আমরা তার প্রতি হামলা করা থেকে বিরত রইলাম, কিন্তু মিহলাম ইবন জুছামা তার উপর হামলা করলেন এবং তাকে হত্যা করলেন । তাদের এ দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য ছিল । তিনি তার উটও অন্যান্য পরিত্যক্ত সামগ্রী গনীমত হিসেবে লাভ করেন। আমরা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ফিরে আসলাম এবং তাঁকে এ ঘটনা সম্পর্কে জানালাম তখন আমাদের মাঝে অবতীর্ণ হল :  

ضربتم في سبيل الله فتبينوا ولا تقولوا لمن القي اليكم السلام لست مؤما تتون عرض الحياة الدنيا عند الله غائم كثير كذالك نتم من قبل

অর্থাৎ হে মুমিনগণ।

তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করবে তখন যাচাই করে নেবে এবং কেউ তোমাদের সালাম না দিলে ইহজীবনের সম্পদের আকাংখায় তাকে বলবেনা, তুমি মু’মিন নও; কারণ, আল্লাহর নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর রয়েছে। তোমরাও পূর্বে এরূপই ছিলে, এরপর আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং তোমরা যাচাই করে নেবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ্ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।” (৪- নিসা : ৯৪)

ইমাম আহমদ (র) ও– আবু হাদরাদ (রা) হতে এরূপ বর্ণনা করেন ।

ইবন ইসহাক– যুবায়র (রা) ও তাঁর পিতা আওয়াম (রা) হতে বর্ণনা করেন। তারা উভয়ে হুনায়ন যুদ্ধে যোগদান করেন এবং বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একদিন যুহরের সালাত আদায় করেন। এরপর তিনি একটি গাছের ছায়ায় গিয়ে বসেন। তখন উয়ায়না ইবন বদর, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে নিহত আমির ইবন আল-আযরাত আল-আশজাঈ এর রক্তপণ দাবী করে, কেননা, সে ছিল আমিরের মুনিব। তাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “তোমরা কি এখন ৫০টি উট গ্রহণ করতে এবং মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর বাকী ৫০টি উট গ্রহণ করতে রাযী আছ?” উয়ায়না ইবন বদর বলেন, “আল্লাহর শপথ, আমি তার সাথে কোন আপোস করব না। যতক্ষণ না তার রমণীরা ঐরূপ কষ্ট ভোগ করবে যেরূপ আমাদের রমণীরা কষ্ট ভোগ করেছে। বনূ লায়ছের এক ব্যক্তি যাকে ইবন মুকায়াতিল বলা হয়, আবার সে আকারেও খাট ছিল । সে বলতে লাগল, “হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামের ছত্রছায়ায় প্রতারণার ক্ষেত্রে তাদের উপমা দেয়া চলে এমন কতগুলো বকরীর সাথে যেগুলো পানি পান করতে এসে এদের অগ্রভাগে যেগুলো রয়েছে এরা পানি পান করে আর পশ্চাতেরগুলো পালিয়ে যায়। অর্থাৎ তাদের মধ্যে কোন প্রকার একতা কিংবা সহযোগি–তার মনোভাব নেই । আজকে এক প্রকার ঘটনা ঘটায়, পরদিন আবার অন্যরূপ ঘটনা ঘটাবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “তোমরা কি এখন ৫০টি উট গ্রহণ করতে এবং মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর বাকী ৫০টি উট গ্রহণ করতে রাযী আছ?” এরূপ অনেকবার অনুরোধের পর সে তা গ্রহণ করতে রাযী হল । মিহলাম ইবন জুছামার লোকজন বলতে লাগল, “চল, আমরা মিহলামকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে যাই। যাতে তিনি তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। রাবী বলেন, একজন দীর্ঘকায়, সুস্বাস্থ্যবান এবং যুদ্ধ ক্ষেত্রে ব্যবহৃত চাদর পরিহিত ব্যক্তি এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে দাঁড়াল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “হে আল্লাহ! মিহলামকে মাফ করবেন “এ কথাটি তিনি তিনবার বলেন। লোকটি দাঁড়িয়ে রইল এবং কাপড় দিয়ে অশ্রু মুছতে ছিল ।

মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেন, “মিহলামের লোকেরা মনে করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) পরবর্তীতে তার জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। উপরোক্ত বর্ণনার ন্যায় আবু দাউদ ও ইবন মাজা বিভিন্ন সনদে এ ঘটনাটি বর্ণনা করেন।

ইবন ইসহাক, আবু নর— সালিম হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমিরের লোকজন রক্তপণ কবুল করেন নাই যতক্ষণ পর্যন্ত না আকরা’ ইবন হাবিস (রা) তাদের সাথে একান্তে আলোচনা করেন। আকরা (রা) বলেন, “হে কায়সের বংশধরগণ! রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাদের মধ্যে মীমাংসার খাতিরে তোমাদেরকে বলেছেন, একটি নিহত ব্যক্তির হত্যার জন্যে রক্তপণ গ্রহণ করতে, আর তোমার তার কথা অমান্য করছ। তোমরা কি চিন্তা করে দেখছ যে, যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হন, তাহলে তার ক্রোধের কারণে আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হবেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যদি তোমাদের প্রতি লা’নত করেন তাহলে তার লা’নতের দরুন আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদের প্রতি লা’নত করবেন। তোমরা তাকে যেমন করেই হোক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে রক্তপণ গ্রহণ করার জন্যে নিয়ে আস; অন্যথায় বনূ তামীমের ৫০জনকে দাঁড় করিয়ে আমি সাক্ষ্য দিতে বলবো যে, নিহত ব্যক্তিটি কাফির ছিল, সে কোন দিনও এক ওয়াক্ত সালাত আদায় করেনি। কাজেই তার হত্যার জন্যে রক্তপণ দেয়া দরকার হবেনা। তার এ কথায় তারা রক্তপণ নিতে রাযী হয়।

এ বর্ণনাটি বিচ্ছিন্ন সনদে বর্ণিত হয়েছে। ইব্‌ন ইসহাক— হাসান বসরী (র) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, মিহলাম যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে বসলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বললেন, “তুমি কি তাকে নিরাপত্তা দেয়ার পরও হত্যা করেছ?” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার জন্যে বদ-দু’আ করলেন। হাসান বসরী (র) বলেন, “আল্লাহর শপথ! এরপর মিহলাম মাত্র সাতদিন বেঁচে ছিলেন। মৃত্যুর পর তাকে মাটি উপরে নিক্ষেপ করে নিয়েছিল। এরপর মিহলামের আত্মীয়স্বজন আবার তাকে দাফন করল; কিন্তু এবারও তাকে মাটি উপরে নিক্ষেপ করল। এরপর তারা আবার তাকে মাটিতে দাফন করল; কিন্তু এবারও তাকে মাটি নিক্ষেপ করে দিল। এরপর তারা তার উপর কুচি পাথর দিয়ে তাকে চাপা দিল। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে পৌঁছার পর তিনি বলেন, নিশ্চয়ই ভূমি তার থেকে অধিক খারাপ লোককেও বুকে ধারণ করে রয়েছে; কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলার ইচ্ছে হচ্ছে তোমাদের লোকদের বেলায় সংঘটিত ঘটনা দ্বারা তোমাদেরকে শিক্ষা দেওয়া।

ইবন জারীর– ইবন উমর (রা) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মিহলাম ইবন জুছামাকে একটি দলের দায়িত্ব দিয়ে অভিযানে প্রেরণ করেন। পথিমধ্যে আমির ইবন আল-আযবাত সৈন্যদলের সাথে মুলাকাত করেন ও ইসলামী কায়দায় সালাম দেন। তবে তাদের মধ্যে জাহিলিয়াতের যুগে মনোমালিন্য ছিল বিধায় মিহলাম আমিরের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছল । তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে মীমাংসার জন্যে উয়ায়না এবং আরা এর সাথে আলোচনা করেন। আরা (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজকে এ ঘটনা ঘটছে, কাল আবার অন্যটা ঘটবে । এরূপ চলতেই থাকবে । তাই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন । উয়ায়না বলে উঠলেন : “না, আল্লাহর শপথ, এ ব্যাপারে কোন মীমাংসা নেই যতক্ষণ না আমাদের রমণীরা যেরূপ কষ্ট পেয়েছে তাদের রমণীরাও তদ্রূপ কষ্ট পায়। এরপর মিহলাম দুটো চাদরে নিজেকে আচ্ছাদিত করে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সামনে জড়সড় অবস্থায় বসলেন যাতে রাসূল (সা) তাঁর জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে ক্ষমা না করুন! তখন তিনি নিজ চাদর দিয়ে অশ্রুজল মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালেন এবং সাত দিন না যেতেই তিনি ইনতিকাল করলেন । তাকে মাটিতে দাফন করা হলে মাটি তাকে উপরের দিকে নিক্ষেপ করে । মিহলামের আত্মীয় স্বজনরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে এ সংবাদ দেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, নিশ্চয়ই মাটি তোমাদের সাথীর চেয়েও নিকৃষ্টতর লোককে বুকে ধারণ করে রয়েছে। কিন্তু আল্লাহ্ তা’আলা তোমাদেরকে তোমাদের কারো শাস্তির মাধ্যমে উত্তম শিক্ষা প্রদান করে থাকেন। এরপর তাঁকে তারা সকলে মিলে পাহাড়ে রেখে আসে এবং তার উপরে পাথর চাপা দিয়ে দেয়। এ পটভূমিতে। নিম্নবর্ণিত আয়াতটি অবতীর্ণ হয় : অর্থাৎ হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করবে তখন পরীক্ষা নেবে— (৪- নিসা : ৯৪) ( গ্রন্থকার বলেন, বায়হাকী প্রমুখ সূত্রে এ ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে এবং অত্র আয়াতের শানে নুকূল হিসেবে এ ঘটনাটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে; কিন্তু এগুলোতে মিহলাম ও আমিরের নাম উল্লিখিত হয়নি।

আবদুল্লাহ ইবন হুযাফা আস-সাহমীর অভিযান

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আ’মাশ (র)– হযরত আলী ইবন আবু তালিব (রা) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) একদা এক আনসারীকে একটি ক্ষুদ্র সৈন্যদলের নেতৃত্ব দান করেন এবং সৈন্যদলের সদস্যদেরকে নির্দেশ দেন যেন তারা তার কথা শুনে ও তাঁর আনুগত্য করে। রাবী বলেন, “তিনি কোন ব্যাপারে সৈন্যদের প্রতি রাগান্বিত হন এবং তাদেরকে তার জন্যে কাঠ জমা করার নির্দেশ দেন। তারা কাঠ জমা করলেন। তখন তিনি তাদেরকে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন। তারা তা করলেন। এবার তিনি তাদেরকে বললেন, “তোমাদেরকে আমার কথা শুনার ও আনুগত্য করার জন্যে কি রাসূলুল্লাহ্ (সা) নির্দেশ দেন নাই?” তাঁরা বললেন, “জ্বী, হ্যাঁ” তখন তিনি বললেন, “তোমরা এ আগুনে ঝাঁপ দাও!” রাবী বলেন, তখন তারা একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলেন এবং বললেন, “আমরা আগুন থেকে বাঁচার জন্যেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছি । রাবী বলেন, এরই মধ্যে নেতার রাগ পড়ে যায় এবং আগুনও নিভে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে ফিরে এসে তাঁরা যখন এ ঘটনাটি সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে অবগত করলেন, তখন তিনি বললেন, যদি তারা। তাদের নেতার কথায় এ আগুনে ঝাঁপ দিত তাহলে তারা কোন দিনও এ আগুন থেকে বের হতে সক্ষম হতনী । [ ] কেননা, আনুগত্য হয় শুধুমাত্র পুণ্যের কাজে।

হযরত ইবন আব্বাস (রা)-এর মাধ্যমেও সহীহ্ বুখারী এবং সহীহ্ মুসলিমে এ ঘটনাটির উল্লেখ রয়েছে।

গ্রন্থকার বলেন, “এ ঘটনাটি সম্পর্কে আমার তাফসীরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

উমরাতুল কাযা

হুদায়বিয়া সন্ধির সময় বাধাপ্রাপ্ত ও স্থগিত উমরাটি সপ্তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ (সা) আদায় করেন।

এ উমরাকে উমরাতুল কিসাসও বলা হয়। সুহাইলী (র) এ অভিমতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কেউ কেউ উমরাতুল কাযিয়্যা নামেও এ উমরাকে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন : অর্থাৎ সমস্ত পবিত্র বিষয় যার অবমাননা নিষিদ্ধ তার জন্যে কিসাস। কেননা, কোন বস্তুর পবিত্রতা উভয় পক্ষের সমভাবে রক্ষণীয়। (২-বাকারা : ১৯৪)।

তৃতীয় নাম মীমাংসার উমরা। কেননা, হুদায়বিয়ার সন্ধিতে মীমাংসা করা হয়েছিল যে, এ বছর মুসলমানগণ উমরা না করেই মদীনায় ফিরে যাবেন এবং পরের বছর তারা উমরা পালনের উদ্দেশ্যে কোষবদ্ধ অস্ত্র সহকারে মক্কা প্রবেশ করতে পারবেন । আর তারা তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবেন না। এই উমরা-এর কথা ৪৮নং সূরা আল-ফাতিহ-এর ২৭তম আয়াত। আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেন :

الرؤيا بالحق لتدخن المسجد الحرام ان شاء الله آمنين محلقين رؤسكم ومقصرين لأنساقون فعلم ما لم تعلموا فجعل من دون ذلك فتحا قريبا ۔

অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায তোমরা অবশ্যই মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে- কেউ কেউ মস্তক মুণ্ডিত করবে, কেউ কেউ কেশ কর্তন করবে। তোমাদের কোন ভয় থাকবে না। আল্লাহ্ জানেন, যা তোমরা জানো। এছাড়াও তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন এক সদ্য বিজয় অর্থাৎ খায়বারের বিজয়।

গ্রন্থকার (র) বলেন, “আমার তাফসীরে এ সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।”

উমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছিলেন, ‘আপনি কি আমাদেরকে বলেননি যে, আমরা কা’বা ঘরে আগমন করব এবং তার তওয়াফ করব? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “হ্যাঁ, তবে আমি কি তোমাকে বলেছিলাম যে এ বছরই তুমি আগমন করবে এবং তার তওয়াফ করবে? উমর (রা) বললেন, ‘জ্বী না’। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, নিশ্চয়ই তুমি পরবর্তী বছর এখানে আগমন করবে এবং তার তওয়াফ করবে। আর এ কথাটিই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)-এর কবিতায় এবং উপরোক্ত আয়াতে। কাযার ওমরাহ পালনের দিন যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় প্রবেশ করছিলেন তখন তিনি তাঁর সামনে নিম্ন বর্ণিত কবিতাটি আবৃত্তি করেন :

 اليوم تضربكم على اوله +

خوابنى الكفار عن سبيل كما ضربناكم على تنزيله *

অর্থাৎ হে কাফিরের গোষ্ঠি, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রাস্তা থেকে সরে পড় । আজকে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে যেমন আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি তার উপর অবতীর্ণ বাণীকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে। কাযার ওমরাহ ছিল রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দেখা স্বপ্নের বাস্তবায়ন । আর এ বাস্তবায়ন ছিল ভোরের আলোর ন্যায় স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট।

ইবন ইসহাক বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) যখন খায়বার হতে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন তখন তথায় রবিউল আউয়াল, রবিউছ ছানী, জুমাদাল উলা, জুমাদাল উখরা, রজব, শা’বান, রমযান ও শাওয়াল মাস পর্যন্ত অবস্থান করেন। এ কয়েক মাসে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৈন্যদল প্রেরণ করেন। এরপর যুলকা’দা মাসে তিনি গত বছরের একই মাসে মক্কার কাফিরগণ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত উমরা আদায় করার জন্যে ঘর থেকে বের হলেন। ইবন হিশাম বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় উয়ায়ফ ইবনুল আবাত আদ-দুয়ালীকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করেন। কাযার উমরাহকে কিসাসের উমরাও বলা হয়। কেননা, মক্কার মুশরিকগণ ৬ষ্ঠ হিজরীর যুলকাদাহর পবিত্র মাসে উমরা করার জন্য আগত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও তার সংগিগণকে বাধা প্রদান করেছিল। পরবর্তী বছর একই মাসে উমরা পালন করে পূর্বের অনুরূপ উমরা আদায় করেন। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ৭ম হিজরীর যুলকাদা মাসে উমরাহ পালনের জন্যে পবিত্র মক্কায় প্রবেশ করেন। ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, “আল্লাহ্ তা’লার এ সম্পর্কে অবতীর্ণ করেন :

অর্থাৎ সমস্ত পবিত্র বিষয় যার অবমাননা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সমান (২-বাকারা? ১৯৪)। মু’তামির (র) নিজ পিতার বরাতে তার মাগাযী গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তন করেন ও মদীনায় অবস্থান করেন তখন বিভিন্ন দিকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সৈন্যদল প্রেরণ করেন। এরপর তিনি যুলকাদা মাসে উমরা আদায়ের মনস্থ করেন এবং লোকজনকে তা পালনের জন্যে তৈরির ঘোষণা দেন। লোকজন তৈরি হলেন এবং মক্কার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়ে পড়লেন ।

ইবন ইসহাক বলেন, “মুসলমানদের সাথে কাযার উমরাহতে এমন ব্যক্তিবর্গ ছিলেন যারা গত বছর উমরাহ পালনে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এটা ৭ম হিজরীর ঘটনা। মুসলমানদের আগমনের কথা শুনে মক্কাবাসীরা ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে এবং কুরায়শরা ইত্যবসরে বলতে লাগল যে, মুহাম্মাদ দীনহীন ও অনটনগ্রস্ত। ইবন ইসহাক বলেন, আমাকে– আবদুল্লাহ্ ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও তার আসহাবের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করার জন্যে মক্কাবাসীরা দারুন নওয়ার কাছে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মসজিদে হারামে প্রবেশ করেন তখন বাম কাঁধের উপর এবং ডান বগলের নীচে চাদর স্থাপন করে ডান বাহু খোলা রাখেন। এরপর বলেন, আজকে যে ব্যক্তি কাফিরদের সামনে শক্তিমত্তা প্রদর্শন করবে তার প্রতি হে আল্লাহ্ তা’আলা রহম করুন! হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করার পর দ্রুতগতিতে তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তওয়াফ করেন । অর্থাৎ বায়তুল্লাহ-এর তওয়াফকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করেন। তারপর সাধারণ গতিতে চলতে থাকেন ও রুকনে আসওয়াদ চুম্বন করেন। এরপর আবার দ্রুতগতিতে চলতে থাকেন। এরূপে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তিনটি তওয়াফ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করেন। আর অন্য সবগুলোতে সাধারণভাবে তওয়াফ করেন। ইবন আব্বাস (রা) বলেন, লোকজনের ধারণা ছিল যে, এটা তাদের জন্যে করণীয় হিসেবে অনুমোদিত হবে না এবং এটা রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরায়শদের দেখাবার জন্যেই করেছিলেন । কেননা, তারা ধারণা করেছিল ও বলেছিল যে, মুসলমানগণ মদীনার জ্বর ভোগের পর কৃশকায় ও দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন বিদায় হজ্জ সম্পাদন করেন তখনও তিনি তা আদায় করেন । তাই তা সুন্নত হিসেবে চলে আসছে।

বুখারী (র) বলেন, আমাদেরকে— ইবন আব্বাস (রা) হাদীছ বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও তার সংগিগণ উমরা পালনের জন্য মক্কা আগমন করলে মুশরিকরা বলতে লাগল যে, মুহাম্মাদ মক্কায় আসছেন তবে মদীনার জ্বর তাঁকে এবং তাঁর সংগীদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে। সেজন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সংগিগণকে তওয়াফের তিন পাকে রমল (দ্রুতগতিতে চলা) করার জন্যে এবং দুই রুকনের মধ্যবর্তী জায়গায় সাধারণভাবে তওয়াফ করার জন্যে নির্দেশ প্রদান করলেন। সবগুলো পাকে রমল করার জন্যে নির্দেশ প্রদান করার কারণ হল সর্বদাই এ আমলটি যেন তারা স্বাচ্ছন্দে করতে পারেন।

বুখারী (র)— ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, “যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুশরিকদের স্বীকৃত নিরাপত্তার বছর উমরা পালনের জন্যে মক্কা আগমন করলেন, তখন লোকজনকে নির্দেশ দিলেন, “ তোমরা তওয়াফে রমল কর যাতে মুশরিকগণ তোমাদের শক্তি

অবলোকন করতে পারে। আর মুশরিকগণ কুয়ায়কায়ান নামী পাহাড়ের দিকে অবস্থান করছিল। উপরোক্ত বর্ণনাটি ইমাম মুসলিমও উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম বুখারী (র)– আবু আওফা (রা) হতে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) উমরা পালন করছিলেন তখন আমরা মুশরিক বালকদের থেকে কেউ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ঘিরে রাখছিলাম, যাতে তাদের কেউ রাসূলুল্লাহ (সা)-কে কষ্ট না দিতে পারে।

ইবন ইসহাক বলেন, “আবদুল্লাহ্ ইবন আবু বকর (রা) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কা প্রবেশ করেন এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উষ্ট্রির লাগাম ধরেছিলেন ও নিম্ন বর্ণিত কবিতা আবৃত্তি করছিলেন —

خلوا فكل الخير في رسوله أعرف حق الله في قبوله كما قتلناكم على تنزيله ويذهل الخليل عن خليله

خلوا بنى الكفار عن سبيله يارب انی مؤمن بقيله نحن قتلناكم على تأويله ضربا يزيل الهام عن مقيله

হে কাফিরের গোষ্ঠী! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাস্তা থেকে তোমরা সরে পড়। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পথেই যাবতীয় কল্যাণ নিহিত। হে প্রতিপালক! আমি নিশ্চয়ই তাঁর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমি জানি যে, তাঁকে গ্রহণ করার মধ্যেই রয়েছে আল্লাহ্ প্রদত্ত সত্য। তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ করছি তার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্যে যেমন আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি তার উপর অবতীর্ণ বাণীকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যে। এমন যুদ্ধ যা মাথার খুলিকে তার স্থান থেকে বিচ্যুত করে দেয় এবং বন্ধুকে বন্ধুর কথা ভুলিয়ে দেয়।

ইবন হিশাম বলেন, উপরোক্ত পংক্তিগুলো আসলে আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)-এর যা তিনি সিফফীনের যুদ্ধে আবৃত্তি করেছিলেন। এটা সুহায়লীর অভিমত। ইবন হিশাম আরো বলেন, উপরোক্ত দাবীর প্রমাণ হচ্ছে যে, আবদুল্লাহ্ ইবন রাওয়াহা (রা) মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন অথচ মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি অবতীর্ণ বাণীকে স্বীকার করে নাই। আর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যে যুদ্ধ করা হয় ঐসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যারা আসমানী বাণীকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই এগুলো আম্মার ইবন ইয়াসির (রা) কর্তৃক আবৃত্তিকৃত কবিতা হওয়াই যুক্তিযুক্ত।

লেখক বলেন, ইবন হিশামের এ যুক্তি সন্দেহাতীত নয়। কেননা, হাফিয বায়হাকী– আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “কাযার উমরা পালন করার জন্যে রাসূলুল্লাহ (সা) যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে হাঁটতেছিলেন। অন্য বর্ণনায় রয়েছে যে, তিনি উস্ত্রীর রশি ধরে রেখেছিলেন এবং বলছিলেন :

قد نزل الرحمن في تنزيله نحن قتلناكم على تأويله اليوم نضربكم على تنزيله

وذهل الخليل عن خليله

خلوا بنى الكفار عن سبيله بأن خير القتل في سبيله خلوا بنى الكفار عن سبيله ضربا يزيل الهام عن مقيله يارب انی مؤمن بقيله

হে কাফিরের গোষ্ঠী! রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রাস্তা ছেড়ে দাও। তাঁর প্রতি অবতীর্ণ বাণীতে দয়াময় আল্লাহ্ তা’আলা এ তথ্য অবতীর্ণ করেন যে, আল্লাহর পথে নিহত হওয়াই উত্তম মৃত্যু। আর আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়ছি তার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্যে।

উপরোক্ত অবিকল সনদের অন্য বর্ণনায় রয়েছে : হে কাফিরের গোষ্ঠী! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পথ থেকে সরে দাঁড়াও। আজকে আমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আসমানী বাণী প্রতিষ্ঠিত করার জন্য লড়ব । এমন লড়াই যা তোমাদের মাথার খুলি স্থানচ্যুত করে দেবে এবং যার ভয়াবহতায় বন্ধু বন্ধুকে ভুলে যাবে। হে আমার প্রতিপালক! আমি তাঁর কথায় আস্থা স্থাপন করেছি।

ইউনুস ইবন বুকায়র (র)– যায়দ ইবন আসলাম (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) উমরাতুল কাযার বছর উমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করেন। উস্ত্রীর উপর সওয়ার অবস্থায় কাবা ঘরের তওয়াফ করেন। ছড়ি দ্বারা হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন।

ইবন হিশাম বলেন, কোন ওযর ছাড়াই তিনি ছড়ি দ্বারা চুম্বন করেন। লোকজন তাঁর চতুর্দিকে ভিড় জমিয়ে দিলেন। এবং আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) নিম্ন বর্ণিত কবিতাগুলো আবৃত্তি করেছিলেন।

এ সত্তার নামে আমরা জিহাদ করছি যার অবতীর্ণ দ্বীন ব্যতীত অন্যকোন গ্রহণীয় দীন নেই। হে কাফিরের গোষ্ঠী! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াও।

মূসা ইবন উকবা, যুহরী (র) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “হুদায়বিয়া সন্ধির পরবর্তী বছর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ৭ম হিজরীর যুলকাদা মাসে উমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন। পূর্ববর্তী বছরের একই মাসে মক্কার মুশরিকগণ রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবায়ে কিরামকে মাসজিদুল হারাম হতে বিরত রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন ইয়াজিজ নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন ঢাল, বর্ম, তীর, বর্শা ইত্যাদি যাবতীয় অস্ত্র খুলে রাখেন এবং সাহাবা কিরামসহ তিনি ভ্রমণকারীদের জন্যে সাধারণভাবে প্রযোজ্য অস্ত্র-শুধু তলোয়ার সাথে রাখেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জাফর ইবন আবু তালিব (রা)-কে মায়মূনা বিন্ত হারিছ আমিরীয়া (রা)-এর কাছে প্রেরণ করেন। তিনি তার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে বিবাহের প্রস্তাব দেন। তিনি তার ব্যাপারটি আব্বাস (রা)-এর নিকট সমর্পণ করেন। কেননা, তার বোন উম্মুল ফযল বিন্ত হারিছ (রা) আব্বাস (রা)-এর স্ত্রী ছিলেন। এরপর আব্বাস (রা) মায়মূনা (রা)-কে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে বিয়ে দেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মক্কায় উপস্থিত হন তখন তিনি তাঁর সংগীদেরকে বাহুখুলে তওয়াফের সময় রমল করার নির্দেশ প্রদান করেন, যেন মুশরিকরা মুসলমানদের শৌর্য-বীর্য ও শক্তি-সামর্থ্য অবলোকন করতে পারে। অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সম্ভাব্য উপায়ে মুশরিকদের ষড়যন্ত্রের মুকাবিলার ব্যবস্থা করেন। ফলে মক্কাবাসীরা তাদের লোকজন, রমণী ও ছেলে-মেয়েদেরকে তওয়াফরত রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলমানদের প্রতি অবলোকন করা থেকে বিরত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা) তলোয়ারে সজ্জিত হয়ে ।al; ALL KI– শীর্ষক পংক্তিগুলো আবৃত্তি করেন।

রাবী বলেন, “ক্রোধ, রাগ, রোষ, শত্রুতা, ঘৃণা ও হিংসার বশবর্তী হয়ে মুশরিকদের কতিপয় প্রধান ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি অবলোকন করা থেকেও বিরত থাকে। তারা মক্কা থেকে অনুপস্থিত হয়ে আল-খানদামা নামী পাহাড়ের দিকে চলে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় তিনদিন তিনরাত অবস্থান করেন। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে উল্লিখিত তিনদিনের তৃতীয় দিন শেষ হলে চতুর্থদিনের সকাল বেলায় সুহায়ল ইবন আমর ও হুয়াইতিব ইবন আবদুল উযযা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট আগমন করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন আনসারদের নিয়ে একটি মজলিসে উপস্থিত ছিলেন এবং মদীনার সা’দ ইবন উবাদা (রা)-এর সাথে কথা বলছিলেন। কাফির সর্দার হুয়াইতিব ইবন আবদুল উয্য চীষ্কার করে বলতে লাগল, “আমরা আল্লাহর শপথ উচ্চারণ করে বলছি, চুক্তির তিন দিন শেষ হয়ে গেছে। তুমি আমাদের জনপদ থেকে এখনও বের হয়ে গেলে না“। সা’দ ইবন উবাদা (রা) বলেন, “তুমি মিথ্যা বলছ। তোমার মা যেন হারিয়ে যায়, এ যমীন তোমারও নয়, তোমার বাপ দাদারও নয়। আল্লাহর শপথ, তিনি বের হবেন না।” এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সুহায়ল ও হুয়াইতিবকে ডেকে বললেন, “আমি তোমাদের এক রমণীকে বিয়ে করেছি। তোমাদের কোন ক্ষতি হবে না যদি আমরা এখানে অবস্থান করি, খাদ্য তৈরী করি, আহার করি এবং তোমরাও আমাদের সাথে আহার কর।” তারা বলল, “আমরা এসব কিছু জানি না ও বুঝি না। আল্লাহর শপথ উচ্চারণ করে তোমাকে আমরা আবারও বলছি। তোমার চুক্তিতে বর্ণিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তুমি এখনও আমাদের এখান থেকে চুক্তি মুতাবিক বের হচ্ছ না।” এর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু রাফি (রা)-কে সৈন্যদের রওয়ানা হবার জন্যে ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সওয়ার হলেন এবং বাতনে সারিফ নামক স্থানে অবতরণ করলেন। মুসলমানগণও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সেখানে অবস্থান করলেন। মায়মূনা (রা)-কে নিয়ে আসার জন্যে পূর্বেই আবু রাফি (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় রেখে এসেছিলেন। মায়মূনা (রা) না আসা পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে সারিফে অপেক্ষা করতে লাগলেন। দুষ্কৃতকারী মুশরিকরা ও তাদের দুষ্ট ছেলেমেয়েরা মায়মূনা (রা) ও তাঁর সাথীদেরকে উত্যক্ত করে। মায়মূনা (রা) যখন সারিফে আগমন করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে তার বাসর হয়। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) রওয়ানা হয়ে মদীনায় গিয়ে পৌঁছলেন। আল্লাহ্ তা’আলা সারিফে মায়মূনার মৃত্যু নির্ধারণ করেন যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে তার বাসর ঘর হয়েছিল। সুতরাং পরবর্তীকালে সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

অতঃপর রাবী হামযা (রা)-এর কন্যার ঘটনা বর্ণনা করেন এবং বলেন, “কাযার উমরা সম্বন্ধে আল্লাহ্ তা’আলা অত্র আয়াত অবতীর্ণ করেন। ‘‘ । ..JL .J ১. অর্থাৎ পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে সমস্ত পবিত্র বিষয় যার অবমাননা নিষিদ্ধ তার। জন্যে কি সাস। (২- সূরা বাকারা : ১৯) পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ (সা) যে পবিত্র মাসে বাধাগ্রস্ত হন সে মাসেই উমরা আদায় করেন।

ইবন লাহী’আ অন্য এক সনদে উপরোক্ত ঘটনা বর্ণনা করেন। বিভিন্ন হাদীছেও এ ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায়। সহীহ্ বুখারীতে ইবন উমর (রা) হতে বর্ণিত রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) উমরাহ এর উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন; কিন্তু কুরায়শের কাফিররা হুদায়বিয়া নামক স্থানে তাকে বাধা প্রদান করে। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানেই কুরবানী করেন ও মাথা মুন্ডন করেন। আর কাফিরদের সাথে সন্ধি মুতাবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, পরবর্তী বছর তিনি উমরা পালন করবেন এবং সংগে তলোয়ার ব্যতীত অন্য কোন অস্ত্র বহন করবেন না। যতদিন মুশরিকগণ পসন্দ করবে ততদিন রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় অবস্থান করবেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) পরবর্তী বছর উমরা পালনার্থে মুশরিকদের সাথে কৃত সন্ধি মুতাবিক মক্কায় প্রবেশ করেন। তথায় তিন দিন অবস্থান করার পর মুশরিকরা তাঁকে বের হয়ে যেতে বললে, তিনি বের হয়ে যান।

ওয়াকিদী– ইবন উমর (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এটা কার উমরা পালন ছিলনা; বরং এটা ছিল মুসলমানদের উপর একটি শর্ত যে, যে মাসে তাঁরা মুশরিকগণ কর্তৃক বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন ঠিক ঐ মাসেই তারা পরবর্তী বছর উমরা পালন করবেন।

আবু দাউদ (র)– মাইমূন ইবন মিহরাণ (র) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “যে বছর সিরিয়ার অধিবাসীরা আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়র (রা) কে মক্কায় অবরোধ করেছিল সে বছর আমি উমরা পালনের জন্যে ঘর থেকে বের হলাম। আমার সম্প্রদায়ের কিছু সংখ্যক লোক আমার সাথে তাদের কুরবানীর পশু প্রেরণ করেন। তিনি আরো বলেন, “যখন সিরীয় সেনাদলের কাছে আমি পৌঁছলাম তখন তারা আমাকে হেরেম শরীফে প্রবেশে বাধা দিল। তখন আমি সে স্থানেই কুরবানী করলাম ও হালাল হলাম এবং বাড়ী ফিরে আসলাম। পরের বছর গত বছরের উমরা পালন করার জন্যে আমি ঘর থেকে বের হলাম। এরপর আমি ইবন আব্বাস (রা)-এর কাছে হাযির হয়ে কুরবানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, “গত বছরের কুরবানীর পরিবর্তে নতুন করে এ বছর একটি কুরবানী আদায় কর। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবায়ে কিরামকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, হুদায়বিয়ার বছর যে কুরবানী দিয়েছ তার পরিবর্তে এ বছর কাযার উমরা পালনের সময়ও কুরবানী কর।” এটি আবু দাউদ (র)-এর একক বর্ণনা।

হাফিয বায়হাকী (র)– আমর ইবন মায়মূন হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমার পিতা উমরা পালনকারী বহু লোককে জিজ্ঞেস করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হুদায়বিয়ায় অবরুদ্ধ হয়ে যে কুরবানী করেছিলেন পরের বছর কি তার পরিবর্তে অন্য একটি কুরবানী করেছিলেন। কিন্তু কারোর কাছে উত্তর পেলেন না। পরে আমি তার কাছে শুনেছি যে, তিনি আবু হাযির আল-হিমইয়ারীকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি তাকে বলেন, অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ব্যক্তিকেই তুমি জিজ্ঞেস করেছ। ইবন যুবায়র (রা)-কে যে বছর অবরোধ করা হয় সে বছর আমি হজ্জ করতে বের হয়েছিলাম এবং কুরবানীর পশুও খরিদ করেছিলাম। সিরিয়াবাসী সৈন্যরা আমার ও বায়তুল্লার মাঝখানে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। তখন আমি হেরেম শরীফে কুরবানী করলাম ও ইয়ামানে ফিরে গেলাম এবং নিজে নিজে বলতে লাগলাম, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আদর্শ আমার জন্য যথেষ্ট। পরের বছর হজ্জ পালন করার জন্যে আমি মক্কায় আগমন করলাম। হজ্জের অন্যান্য আহকাম আদায় করার পর আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)-এর সাথে সাক্ষাত করে গত বছরের কৃত কুরবানী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম যে, এটার পরিবর্তে কি নতুন করে কুরবানী করতে হবে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, এটার পরিবর্তে আরো একটি নতুন কুরবানী কর। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম হুদায়বিয়ায় যে কুরবানী করেছিলেন কাযার উমরা পালনের সময় তার পরিবর্তে নতুন করে কুরবানী করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাতে উটের অপ্রতুলতা দেখা দেয় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবায়ে কিরামকে গরু কুরবানী করার অনুমতি দেন।

ওয়াকিদী– ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “ রাসূলুল্লাহ্ (সা) নাজীয়া ইবন জুনদুব আল-আসলামী (রা) কে কুরবানীর জন্তুকে বন্য গাছ গাছড়ায় চরিয়ে রাখার জন্যে নিযুক্ত করেন। তার সাথে ছিল আসলাম গোত্রের আরো চার ব্যক্তি। কাযার উমরা পালনের কালে রাসূলুল্লাহ (সা) ষাটটি কুরবানীর পশু প্রেরণ করেছিলেন।

আবু হুরায়রা (রা) বলেন, আমি উট হাঁকাবার জন্যে উটের মালিকের সাথে ছিলাম ।

ওয়াকিদী বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) ইহরাম বাঁধার পর তালবিয়া পড়ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা) ঘোড়াগুলোকে নিয়ে মা যাহরানে পৌঁছলেন এবং সেখানে কুরায়শের কিছু সংখ্যক লোকের সাথে সাক্ষাত করলেন। তারা মুহাম্মাদ ইবন মাসলামা (রা)-এর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করল। উত্তরে তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) আগামী দিন ভোরে এ মাযিলে পৌঁছবেন। তারা বাশীর ইবন সা’দ (রা)-এর কাছে বহু অস্ত্রশস্ত্র দেখতে পেল এবং তারা ওখান থেকে তৎক্ষণাৎ বের হয়ে গেল। তারা যা কিছু অস্ত্রশস্ত্র ও ঘোড়া ইত্যাদি দেখল এ সম্বন্ধে কুরায়শদেরকে অবহিত করল। কুরায়শরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল আর বলতে লাগল, আল্লাহর শপথ! আমাদের এখানে কী ঘটে গেল। আমরাতো চুক্তিবদ্ধ আছি। মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের আমাদের সাথে কী করতে চাচ্ছেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) মারুয যাহরানে উপনীত হলেন এবং অস্ত্রশস্ত্র বাতনে ইয়াজিজে অগ্রে পাঠিয়ে দেন যেখান থেকে হেরেম শরীফ অবলোকন করা যায় । কুরায়শগণ মিকরায ইবন হাক্স ইবন আহনাফ-এর নেতৃত্বে কুরায়শদের কিছু সংখ্যক লোককে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে প্রেরণ করে ও তারা বাতনে ইয়াজিজে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাত করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরবানীর পশু ও অস্ত্রশস্ত্রসহ সাহাবায়ে কিরাম পরিবেষ্টিত অবস্থায় অবস্থান করছিলেন। তারা বলতে লাগল, “হে মুহাম্মাদ! আপনি আপনার শৈশব ও কিশোর কোন কালেই বিশ্বাসঘাতকতার জন্যে অভিযুক্ত হননি। আর এখন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিজ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে হেরেম শরীফে প্রবেশ করছেন? অথচ আপনি তাদের সাথে সন্ধি করেছেন এই বলে যে, তলোয়ার খাপে রেখে মুসাফিরের ন্যায় হেরেম শরীফে প্রবেশ করবেন।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “আমি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হেরেম শরীফে প্রবেশ করব না। তখন মুকরিয ইব্‌ন হাফস বলল, ইনি তো এমন এক সত্তা, যে অংগীকার রক্ষা ও পুণ্য কাজ সম্পাদনে অত্যন্ত সুপরিচিত। এরপর সে তার সংগীদের নিয়ে মক্কায় ফিরে গেল। মুকরিয ইবন হাফ যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংবাদ নিয়ে মক্কায় আগমন করল তখন কুরায়শগণ পরিবার-পরিজন নিয়ে মক্কা ত্যাগ করে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে গেল এবং বলতে লাগল “আমরা মুহাম্মাদ ও তাঁর সঙ্গীদের দিকে তাকিয়েও দেখব না।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরবানীর পশুগুলোকে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্যে নির্দেশ দিলেন। আর যখন তিনি যুতাওয়া পৌঁছলেন তখন তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ তালবিয়া পড়তে শুরু করলেন। তাঁরা তলোয়ার সজ্জিত ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন, তাঁর উন্ত্রী কাসওয়ায় উপবিষ্ট; যখন তারা যুতাওয়ার শেষ প্রান্তে পৌঁছলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাসওয়ার উপর উপবিষ্ট অবস্থায় থেমে গেলেন। আবদুল্লাহ্ ইবন রাওয়াহা (রা) উস্ত্রীর লাগাম ধরে যুদ্ধ কবিতা আবৃত্তি করছিলেন এবং বলছিলেন, “হে কাফিরের গোষ্ঠী! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পথ তোমরা ছেড়ে দাও, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর রাস্তা থেকে তোমরা সরে দাঁড়াও …..!

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রয়েছে। তিনি বলেন, “সপ্তম হিজরীর যুলকা’দা মাসের চার তারিখ ভোরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবায়ে কিরাম মক্কায় আগমন করলেন। তখন মুশরিকরা বলতে লাগল, ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কাছে বিদেশী প্রতিনিধির বেশে আসছেন তবে ইয়াসরিবের জ্বর ও বিরূপ আবহাওয়া তাঁকে এবং তাঁর সংগীদেরকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবাদেরকে তওয়াফের সময় তিন পাকে রমল করার জন্যে নির্দেশ দেন এবং বাকী চার পাকে ও দুই রুকনের মধ্যবর্তী জায়গায় সাধারণভাবে চলার আদেশ দেন। যেহেতু এ হুকুমটি স্থায়ী সেহেতু সম্ভবত রাসূলুল্লাহ্ (সা) সকল পাকে রমল করতে নির্দেশ দেননি।

ইমাম আহমদ— ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) উমরাহ পালনের লক্ষ্যে যখন মারুহ যাহনে অবতরণ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছে যে, কুরায়শগণ মুসলমানদের সম্পর্কে এ অপবাদ রটাচ্ছে যে, মুসলমানগণ দুর্বলতার কারণে একে অন্যের কাছে গিয়ে কুশল বিনিময়ও করতে পারেনা। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণ বললেন, আমাদের অনুমতি দিন, যেন আমরা আমাদের কোন বাহন পশু যবেহ করি তারপর তার গোশত ও ঝোল খেয়ে পরদিন সকালে জনসমাবেশে যাই যাতে করে আমাদের মধ্যে স্বস্তির ভাব পরিলক্ষিত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, না এরূপ করবেনা; বরং তোমাদের যা আছে তা নিয়ে আমার কাছে আস। তারা তাদের নিকট রক্ষিত খাদ্যদ্রব্যাদি নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে একত্রিত করলেন এবং দস্তরখান পাতা হল। তাঁরা পেট ভরে খেলেন এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ পাত্র পূর্ণ করে নিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) অগ্রসর হয়ে মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করলেন। আর কুরায়শরা হাতিমের দিকে বসে রইল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ডান বাহু খোলা রেখে বাম হাতের বগলের নীচে চাদর পরিধান করেন এবং সাহাবীদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, “কুরায়শ সম্প্রদায় যেন তোমাদের মধ্যে কোন দুর্বলতার চিহ্ন দেখতে না পায়। হজরে আসওয়াদ চুম্বন কর এবং রমল কর । তারপর রুকনে ইয়ামানী হতে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে চল।” কুরায়শরা বলতে লাগল, “মুসলমানরা সাধারণভাবে হাঁটতে রাযী নয়, তারা যেন হরিণের ন্যায় দৌড়াচ্ছে।’ রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবীগণ তিন পাকে রমল করেন এবং তা সুন্নত হিসেবে পরিগণিত হয়। রাবী আবু তুফায়ল বলেন, ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিদায় হজ্জেও এরূপ রমল করেছেন। এটি ইমাম আহমদ (র)-এর একক বর্ণনা ।

ইমাম মুসলিম ও– ইবন আব্বাস (রা) হতে অনুরূপ বর্ণনা করেন। জমহুর উলামার মতে তওয়াফে রমল করা সুন্নত। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সা) কাযার উমরা পালনের সময় রমল করেছেন। জিয়িরানার উমরা পালনের সময়ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) তওয়াফে রমল করেছেন। ইমাম আবূ দাঊদ এবং ইমাম ইবন মাজাহ ও– ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম প্রমুখ জাবির (রা) হতেও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিদায় হজ্জের তওয়াফে রমল করেছেন। উমর (রা) রমল সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, এখন আর রমলের কী প্রয়োজন? আল্লাহ তাআলা তো ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা) কোন কাজ করেছেন বলে প্রমাণিত হলে আমরা সে কাজ করা থেকে বিরত থাকব না। এ বিষয়ে কিতাবুল আহকামে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।

প্রসিদ্ধ মতে ইবন আব্বাস (রা) তওয়াফে রমল করাকে সুন্নত মনে করতেন না। সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা রয়েছে যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) কাবা ঘর ও সাফা মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে যে সাঈ করেছেন তা মুশরিকদের কাছে মুসলমানদের শক্তি প্রদর্শন করার জন্যে। এটা হচ্ছে বুখারীর ভাষ্য।

ওয়াকিদী বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাযার উমরা পালনের সময় যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কা’বা ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সেখানে বেশ কিছুক্ষণ অবস্থান করলেন।” বিলাল (রা) কাবার ছাদে উঠে যুহরের সালাতের আযান দেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ইকরামা ইবন আবু জাহল বলল, আল্লাহ্ আবুল হাকাম (আবূ জাহ্নল)-কে মৃত্যু দান করে সম্মানিত করেছেন; কেননা, এই দাসের উচ্চারিত শব্দমালা তাকে শুনতে হচ্ছে না।’ সাফওয়ান ইবন উমাইয়া বলল, আল্লাহর জন্যে সমস্ত প্রশংসা, যিনি আমার পিতাকে এসব দেখার পূর্বে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। খালিদ ইবন ওসয়দ বলল, “আল্লাহর জন্যে সমস্ত প্রশংসা, যিনি আমার পিতাকে মৃত্যুদান করেছেন। কেননা, আজ ঘরের ছাদে দাঁড়িয়ে বিলাল যে হাঁক দিচ্ছে তা তাকে দেখতে হয়নি।” সুহায়ল ইবন আমর ও তার সাথে কিছু সংখ্যক লোক যখন আযানের আওয়ায শুনল, তখন তারা তাদের চেহারা ঢেকে নিল। হাফিয বায়হাকী (র) বলেন, পরবর্তীকালে প্রায় সকলেই তাদের আল্লাহ্ তা’আলা ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন।

গ্রন্থকার বলেন, ওয়াকিদীর মাধ্যমে বায়হাকী (র) উল্লেখ করেছেন যে, এটি ছিল কাযার উমরা পালনের ঘটনা; কিন্তু প্রসিদ্ধ অভিমত হল যে, এ ঘটনাটি মক্কা বিজয়ের বছর ঘটেছিল। আল্লাহ তাআলাই অধিক জ্ঞাত।

মায়মূনা (রা)-এর সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিবাহের ঘটনা

ইবন ইসহাক– ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর এ সফরে (কাযার উমরাহ) হযরত মায়মূনা বিন্ত হারিছ (রা)-কে বিবাহ করেন। তিনি ছিলেন (ইহরামের অবস্থায়)। আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব তাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে বিবাহ দেন।

ইবন হিশাম বলেন, মায়মূনা (রা) তার বিবাহের দায়িত্বটি তাঁর বোন উম্মুল ফযলের কাছে সমর্পণ করেন। উম্মুল ফযল তাঁর স্বামী আব্বাস (রা)-এর নিকট এ দায়িত্বটি সমর্পণ করেন এবং আব্বাস (রা) তাঁকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সঙ্গে বিবাহ দিয়ে দেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে তাকে চারশ’ দিরহাম মহর আদায় করেন। সুহায়লী উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিবাহের প্রস্তাব যখন মায়মূনা (রা)-এর কাছে পৌঁছে, তখন তিনি উটের উপর সওয়ার ছিলেন তাই তিনি বললেন, ‘উট এবং উটের উপর যা কিছু রয়েছে সবই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর। সুহায়লী আরো বলেন, মায়মূনা (রা)-এর সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।

وامرأة مؤمن إن وهبت نفسها للنبى إن أراد النبي أن يستنكحها

خالصه لك من دون المؤمنين.

অর্থাৎ এবং কোন মুমিন নারী যদি নবীর নিকট নিজেকে নিবেদন করে এবং নবীও তাঁকে বিবাহ করতে মনস্থ করেন তাও বৈধ। এটা বিশেষ করে তোমারই জন্য, অন্য মুমিনদের জন্যে নয়” (৩৩- আহ্যাব ৫০)।

ইমাম বুখারী (র)– ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মায়মূনা (রা)-কে বিবাহ করেন তখন তিনি ইহরাম অবস্থায় ছিলেন। আর যখন বাসর ঘর উদযাপন করেন তখন তিনি ছিলেন ইহরামমুক্ত। মায়মূনা (রা) সারিফে ইনতিকাল করেন।

বায়হাকী ও দারা কুতনী— ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মায়মূনা (রা)-কে বিবাহ করেন, তখন তিনি ছিলেন ইহরামমুক্ত। উলামায়ে কিরাম ইব্‌ন আব্বাস (রা)-এর প্রথম ব্যাখ্যা প্রসংগে বলেন, “তিনি ছিলেন ইহরাম অবস্থায়” এর অর্থ হল তিনি হারাম মাসে (যুলকাদা) অবস্থান করছিলেন। কোন এক কবি বলেন, তারা উছমান ইবন আফফান খলীফাঁকে মুহরিম অবস্থায় হত্যা করেছিল বলতে হারাম মাস বুঝানো হয়েছে। তখন তিনি আহ্বান করেন, কিন্তু তার মত নিঃসঙ্গ আর কাউকে দেখিনি।

গ্রন্থকার (র) বলেন, এ ধরনের ব্যাখ্যা প্রশ্নাতীত নয়। কেননা, ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত হাদীছ এ ব্যাখ্যার পরিপন্থী। বিশেষ করে তিনি যে বলেছেন : ১১, ৯ J১, ১৯, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) যখন বিবাহ করেন তখন তিনি ছিলেন মুহরিম আর যখন বাসর উদযাপন করেন তখন তিনি ছিলেন হালাল। কেননা, বাসর ঘর উদযাপন ও যুলকাদা মাসেই হয়েছিল। অথচ এটাও ছিল হারাম মাস। বিভিন্ন সনদে এ বর্ণনাটি পাওয়া যায় ।

সাঈদ ইব্ন মুসাইয়িব (র) বলেন, ইবন আব্বাসের এ ধারণাটি সঠিক ছিল না যদিও মায়মূনা (রা) তার খালা ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) হালাল হওয়ার পরই তাকে বিবাহ করেছিলেন। কেননা, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় আগমন করেন। সে সময় তিনি হালাল ছিলেন এবং তখনই বিবাহও অনুষ্ঠিত হয়।

ইমাম মুসলিম ও সুনানের সংকলকগণ– মায়মূনা বিন্‌ত আল-হারিছ (রা) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বিবাহ করেন তখন আমরা সারিফে ইহরামযুক্ত ছিলাম।”

হাফিয বায়হাকী–… আবু রাফি (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মায়মূনা (রা)-কে বিবাহ করেন, তখন তিনি ছিলেন ইহরামযুক্ত এবং তার সাথে বাসর উদযাপন করেন তখনও তিনি ছিলেন ইহরামযুক্ত। আমি তাদের উভয়ের মাধ্যম ছিলাম । তিরমিযী ও নাসাঈ অনুরূপ বর্ণনা করেন। তিরমিযী বর্ণনাটিকে হাসান বলে অভিহিত করেছেন।

গ্রন্থকার বলেন, “মায়মূনা (রা) সারিফে ৬৩ হিজরী মতান্তরে ৬০ হিজরীতে ইনতিকাল করেন।”

কাযার উমরা পালনের পর মক্কা থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের বিবরণ

মূসা ইব্‌ন উা বর্ণনা করেন, কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে চার দিন অতিবাহিত হওয়ার পর [ইবন হিশামের মতে তিন দিন।-–সম্পাদকদ্বয়] হুয়াইতিব ইবন আবদুল উযযাকে প্রেরণ করল যেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) শর্ত মুতাবিক মক্কা থেকে চলে যান। কাফিরদেরকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে তাদের কাছে মায়মূনা (রা)-এর বিবাহের পর ওলীমা করার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রস্তাব দিয়েছিলেন । কিন্তু তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আপনি আমাদের এখান থেকে চলে যান। তখন তিনি চলে গেলেন। ইবন ইসহাকও অনুরূপ বর্ণনা পেশ করেন।

ইমাম বুখারী (র)– আল-বারা’ (রা) থেকে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুলকা’দা মাসে ওমরাহ পালন করতে আসেন। মক্কাবাসীরা তাকে মক্কায় প্রবেশ করার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তিনি তাদের সাথে সন্ধি করেন যে, পরবর্তী বছর তারা তাকে মক্কায় তিন দিন থাকতে দেবে। যখন তারা সন্ধিপত্র লিখল লিখা হল যে, এটা একটি সন্ধিনামা যা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সম্পাদন করেন। কাফিররা বলল, “আমরা এটা মানিন । আমরা যদি আপনাকে রাসূল বলে জানতামই তাহলে আমরা আপনার জন্যে কিছুই নিষেধ করতাম না তবে আপনি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ্। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমি আল্লাহর রাসূল এবং আমি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ্ও বটে। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইবন আবু তালিব (রা)-কে বললেন, “তুমি রাসূলুল্লাহ্’ শব্দটি মুছে ফেল।” তিনি বললেন, না, আল্লাহর শপথ! আমি আপনার নাম কখনও মুছতে পারব না। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) সন্ধিনামাটি হাতে নিলেন এবং তিনি খুব ভাল লিখতে পারতেন না। তবুও তিনি লিখলেন, এটা এমন একটি সন্ধিনামা যা মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ সম্পাদন করলেন যে, তিনি তলোয়ার কোষবদ্ধ রেখে মক্কায় প্রবেশ করবেন, মক্কাবাসীদের কেউ যদি তার অনুগত হয়ে মক্কা থেকে বের হয়ে যেতে চায় তাহলে তিনি তাকে বের করে নেবেন না, পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণের মধ্য থেকে যদি কেউ মক্কায় থেকে যেতে চায় তাহলে তিনি তা নিষেধ করতে পারবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন সন্ধি মুতাবিক মক্কায় প্রবেশ করলেন এবং নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেল তখন কাফিররা হযরত আলী (রা)-এর কাছে আসল এবং বলল, তোমার সাথীকে বল, তিনি যেন আমাদের এখান থেকে বের হয়ে যান। কেননা, নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে। সেমতে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে গেলেন। এ সময় হামযা (রা)-এর শিশু কন্যা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিছু নিলেন এবং হে চাচা, হে চাচা, বলে ডাকতে লাগলেন, আলী (রা) তাকে গ্রহণ করেন এবং তার হাতে ধরেন । আর ফাতিমা (রা)-কে বললেন, তোমার চাচার কন্যাকে নিয়ে নাও। তখন তিনি তাকে উঠিয়ে নিলেন। এরপর আলী (রা), যায়দ (রা) ও জা’ফর (রা) তাকে নিয়ে বিতণ্ডায় লিপ্ত হলেন। আলী (রা) বললেন,আমি তাকে উঠিয়ে নিয়েছি এবং সে আমার চাচার কন্যা। জাফর (রা)ও বলে উঠলেন, ‘সে আমার চাচার কন্যা এবং তার খালা আমার স্ত্রী। যায়দ (রা)ও বলে উঠলেন, সে আমার ভাইয়ের কন্যা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার খালার সাথে তাকে থাকার পক্ষেই রায় দিলেন এবং বললেন, খালা হচ্ছে মায়ের তুল্য। আলী (রা)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, তুমি আমার এবং আমি তোমার । জাফর (রা)-কে বললেন, ‘আমার শরীরের গঠন ও চরিত্রের সাথে তোমার সাজুয্য রয়েছে এবং যায়দ (রা)-কে বললেন, তুমি আমাদের ভাই ও আমাদের মাওলা । আলী (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন, আপনি কি হামযা (রা)-এর কন্যাকে বিয়ে করবেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “সে আমার দুধ ভাইয়ের কন্যা। উপরোক্ত সনদে ইমাম বুখারী এ হাদীছের একক বর্ণনাকারী।

ওয়াকিদী– ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা)-এর কন্যা আম্মারা (রা) মক্কায় অবস্থান করছিল। তার মায়ের নাম ছিল সালমা বিন্ত উমায়স। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মক্কায় আগমন করলেন তখন আলী ইবন আবু তালিব (রা) এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে কথা বলেন। তিনি বলেন, কোন যুক্তিতে আমরা আমাদের চাচার কন্যাকে মুশরিকদের মাঝে ইয়াতীম রূপে মক্কায় ছেড়ে যাবো? রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বের করে নেয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার নিষেধ করলেন না। তাই তিনি তাকে বের করে নিলেন। যায়দ ইবন হারিছা (রা) এ ব্যাপারে কিছু কথা বললেন। তিনি ছিলেন হামযা (রা)-এর মনোনীত ব্যক্তি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মুহাজিরীনকে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) হামযা (রা) ও যায়দ (রা) ইবন হারিছার মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপন করে দিয়েছিলেন। এজন্যে তিনি বলেন, “আমার ভাইয়ের কন্যা হিসেবে তার সম্বন্ধে আমার অধিকার বেশী। যখন একথা জাফর (রা) শুনলেন, তখন তিনি বললেন, খালা মায়ের সমতুল্য। যেহেতু তার খালা আসমা বিত উমায়স আমার স্ত্রী, সেহেতু আমিই বেশী হকদার । আলী (রা) বলেন, “কী হল, আমি দেখতেছি যে, তোমরা তাকে নিয়ে মতবিরোধ করছ অথচ সেতো আমার আপন চাচার কন্যা : আর আমিই তাকে কাফিরদের মধ্য থেকে উদ্ধার করে এনেছি। কাজেই তোমাদের কাছে আম। মত কোন গ্রহণযোগ্য দাবী নেই। সুতরাং তার সম্পর্কে তোমাদের চেয়ে আমার দাবীই অগ্রগণ্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, আমি তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিচ্ছি। হে যায়দ! তুমি আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের মাওলা (আযাদকৃত গোলাম) আর হে জাফর, তুমি আমার শারিরীক গঠন ও চরিত্রের সাথে সামঞ্জস্য পেয়েছ। হে জাফর, তুমি আবার তার সম্পর্কে অধিক অধিকার রাখ, কেননা, তার খালা তোমার স্ত্রী। খালার সাথে বিয়ে করে কোন নারীকে একত্রিত করা যায় না। অনুরূপ ফুফুর সাথেও বিয়ে করে কোন নারীকে একত্রিত করা যায় না। অতএব, ফর (রা)-এর পক্ষেই রাসূলুল্লাহ (সা) রায় প্রদান করলেন। ওয়াকিদী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন জাফর (রা)-এর পক্ষে রায় প্রদান করলেন তখন জাফর উঠে দাঁড়ালেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চতুর্দিকে আনন্দে এক পায়ে চলতে লাগলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, এটা কী হে জাফর? উত্তরে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাসী যখন কারো প্রতি সন্তুষ্ট হতেন, দাঁড়িয়ে যেতেন এবং ঐ ব্যক্তির চতুর্দিকে এক পায়ে হাঁটতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বললেন, “আপনি তাঁকে বিয়ে করুন।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ‘সে আমার দুধ ভাইয়ের কন্যা। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে সালামা ইবন আবু সালামা এর সাথে বিয়ে দিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলতেন, আমি কি আবু সালামার শোধ দিতে পেরেছি?

গ্রন্থকার বলেন, ওয়াকিদী প্রমুখ উল্লেখ করেছেন যে, সালামা তাঁর মা উম্মে সালামার সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিবাহ দিয়েছিলেন। আর সালামা ছিল জ্যেষ্ঠ পুত্র অর্থাৎ উমর ইবন আবু সালামার চাইতে বয়োজ্যেষ্ঠ । আল্লাহ্ই অধিক জ্ঞাত।

ইবন ইসহাক বলেন, “যিলহাজ্জ মাসে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা প্রত্যাবর্তন করেন। তাই মুশরিকরাই এ হজ্জের তত্ত্বাবধান করে। ইবন হিশাম বলেন, এ উমরা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা অবতীর্ণ করেন :

ولقد صدق الله رسوله الرؤيا بالحق لتدخل المسجد الحرام ان شاء الله أمنين محلقين رؤوسكم ومقصرين لا تخافون علم مالم تعلموا فجعل من دون *

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর রাসূলের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছেন, আল্লাহর ইচ্ছায় তোমরা অবশ্যই মাসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে কেউ কেউ মস্তক মুণ্ডিত করবে, কেউ কেউ কেশ কর্তন করবে। তোমাদের কোন ভয় থাকবে না। আল্লাহ্ জানেন তোমরা যা জান না। এটা ছাড়াও তিনি তোমাদের দিয়েছেন এ সদ্য বিজয়। অর্থাৎ আসন্ন খায়বারের বিজয়” (৪৮ : ২৭)।

ইবন আবুল আওজা আস-সুলামীর অভিযান

ইমাম বায়হাকী (র)– যুহরী (র) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন সপ্তম হিজররী যিলহাজ্জ মাসে কাযার উমরা পালন করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। তখন তিনি ইব্ন আবুল আওজা আস-সুলামীকে ৫০জন অশ্বারোহীসহ বনূ সুলায়মের প্রতি প্রেরণ করেন। তাদের গুপ্তচর তাদেরকে মুসলিম ক্ষুদ্র সৈন্যদল সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে সতর্ক করল । তাতে তাদের বহু সংখ্যক লোক মুসলিম সৈন্যদলের বিরুদ্ধে একত্রিত হল। ইবন আবুল আওজা মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে তাদের সম্মুখীন হলেন। রাসূলুল্লাহর সাহাবীগণ তাদের সমাবেশ প্রত্যক্ষ করে তাদেরকে ইসলামের প্রতি দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তারা মুসলিম সেনাদের কথায় কর্ণপাত না করে তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করতে লাগল এবং বলতে লাগল, “তোমরা যে ইসলামের প্রতি আমাদেরকে দাওয়াত দিচ্ছ তাতে আমাদের কাজ নেই। একঘণ্টা যাবত তারা তীর নিক্ষেপ করে। ইতোমধ্যে তাদের জন্যে আরো সাহায্য সহায়তা এসে পৌঁছতে থাকে। এমন কি শেষ পর্যন্ত শত্রু সৈন্যরা মুসলিম ক্ষুদ্র সৈন্যদলকে চতুর্দিক দিয়ে অবরোধ করে ফেলল। মুসলিম সৈন্যগণ তুমুল যুদ্ধ করে তাঁদের অধিকাংশই শাহাদত বরণ করেন। ইব্‌ন আবুল আওজা (রা) মারাত্মকভাবে আহত হন। এরপর তাঁকে মদীনায় আনা হল। তিনি অষ্টম হিজরীর সফর মাসের প্রথম তারিখে অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

এ সনের অন্যান্য ঘটনা

ওয়াকিদী বলেন, ৭ম হিজরীতে হজ্জের সময় রাসূলুল্লাহ (সা) তার কন্যা যয়নবকে তাঁর স্বামী আবুল আস ইবন রাবীর কাছে ফেরত পাঠান। এ বছরেই হাতিব ইবন আবু বালতা মুকাওকিস এর কাছ থেকে মদীনায় ফিরে আসেন। তাঁর সাথে ছিলেন মারিয়া ও সীরীন যারা আসার পথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁদের সাথে আরো ছিল একজন খোঁজ গোলাম। ওয়াকিদী বলেন, ঐ বছরই রাসূলুল্লাহ্ (সা) বসার জায়গা মিম্বরের দুটি সিঁড়ি তৈরী করান। তবে এগুলো যে ৮ম হিজরীর কাজ, এটাই আমাদের কাছে প্রমাণিত।

Related posts

ইরাশী-এর বর্ণনা

Shamim Hossain

হযরত ঈসা (আ)-কে আসমানে উঠিয়ে নেয়ার বর্ণনা

Shamim Hossain

মুহাজির এবং আনসারদের মধ্যে নবী (সা)-এর ভ্রাতৃত্ব স্থাপন

Shamim Hossain

Leave a Comment